Welcome! Login Or Register
Customer care: 01841 114 114 , 01841 115 115 , 9:00 am – 10:00 pm, 7 days a week
 
Cart( 0 )
Your Rating
একাত্তরের দিনগুলি
  13 Ratings | 6 Reviews
Price:   Tk. 300.0   Tk. 258.0
Discount:   Tk. 42.0  ( 14.0 % )
Only 30 Taka Delivery Cost on any amount of purchases
Pay Cash on Delivery all around Bangladesh
Get it in 2-5 working days
Availabilty:  Available at publisher's end
Book Summary
ফ্ল্যাপে লেখা কিছু কথা
তবে তাই হোক। হৃদয়কে পাথর করে বুকের গহীনে বহন করা বেদনাকে সংহত করে দুঃখের নিবিড় অতলে ডুব দিয়ে তুলে আনি বিন্দু বিন্দু মুক্তোদানার মতো অভিজ্ঞতার সকল নির্যাস। আবার আমরা ফিরে তাকাই আমারদের চরম শোক ও পরম গৌরবে মণ্ডিত মুক্তিযোদ্ধের সেই দিনগুলোর দিকে এক মুক্তিযোদ্ধার মাতা, এক সংগ্রামী দেশপ্রেমিকের স্ত্রী, এ দৃঢ়চেতা বাঙালী নারী আমাদের সকলের হয়ে সম্পাদন করেছেন এই কাজ। বুকচেরা আর্তনাদ নয়, শোকবিহ্বল ফরিয়াদ নয়, তিনি গোলাপকুঁড়ির মতো মেলে ধরেছেন আপনকার নিভৃততম দুঃখ অনুভূতি। তাঁর ব্যক্তিগত শোকস্মৃতি তাই মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় আমাদের সকলের টুকরো টুকরো অগণিত দুঃখবোধের অভিজ্ঞতার সঙ্গে, তাঁর আপনজনের গৌরবগাথা যুক্ত হয়ে যায় জাতির হাজারো বীরগাথার সঙ্গে। রুমী বুঝি কোন অলক্ষ্যে হয়ে যায় আমাদের সকলের আদরের ভাইটি, সজ্জন ব্যক্তিত্ত্ব শরীফ প্রতীক হয়ে পড়েন রাশভারী স্নেহপ্রবণ পিতৃরূপের। কিছুই আমরা ভুলবো না, কাউকে ভুলবো না, এই অঙ্গীকারের বাহক জাহানারা ইমামের গ্রন্থ নিছক দিনলিপি নয়, জাতির হৃদয়ছবি ফুটে উঠেছে এখানে।
Book Rating
Average Rating
(Based on 13 Rating(s))
5 star
13
4 star
0
3 star
0
2 star
0
1 star
0
Your Rating
User Reviews
রুমির মায়ের দিনলিপি- এ জেড এম আবদুল আলী
Jahan-E-Noor Apr 1, 2013
শোককে শক্তিতে রূপান্তর করার কথা আমরা প্রায়ই বলে থাকি। একাত্তরের দিনগুলির লেখক জাহানারা ইমামের জীবনে এটি আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। একাত্তরে সবকিছু হারিয়ে তিনি নতুন শক্তিতে বলীয়ান হয়ে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি গঠন করেছেন। তাঁর বইটি পাঠ করা রীতিমতো একটি অভিজ্ঞতা। ওই দিনলিপির প্রথমেই তিনি তাঁর ভয় ও শোকের যাত্রা শুরু করেন এবং এই বইয়ের শেষের পৃষ্ঠাগুলোতে দেখা যাচ্ছে যে তিনি তাঁর পুত্র ও স্বামীকে হারিয়ে আপন শক্তিতে জ্বলে উঠেছেন। তাঁর দিনলিপির প্রথম পৃষ্ঠা শুরু হচ্ছে ১৯৭১-এর পয়লা মার্চ সোমবার, আর শেষ হচ্ছে ওই বছরের ১৭ ডিসেম্বর শুক্রবার। রমনার মাঠে যেদিন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করে তার পরের দিন। এই নয় মাসের মধ্যে একদিন আগস্ট মাসে পাক হানাদার বাহিনী তাঁর স্বামী এবং পুত্রদের বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যায়। কয়েক দিন পর অনেক নির্যাতনের শেষে তাঁর স্বামী শরিফ ইমাম এবং দ্বিতীয় পুত্র জামী এবং অন্য কয়েকজন ফিরে আসেন। কিন্তু রুমি আর ফিরে আসেনি। যুদ্ধের শেষের দিকে তাঁর স্বামী হূদযন্ত্রের প্রক্রিয়া শেষ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। ১৪ ডিসেম্বর যেদিন পাকিস্তানের দোসর রাজাকার আল-বদরেরা ঢাকার বাড়ি বাড়ি থেকে দেশের বুদ্ধিজীবীদের ধরে নিয়ে রায়েরবাজারের বধ্যভূমিতে হত্যা করে, সেদিন শরিফ ইমামের লাশ দাফন করতে বের হয়ে যায় জাহানারা ইমামের আত্মীয়স্বজনেরা। দুই দিন পরে দিনলিপি শেষ হওয়ার এক দিন পর সাতমসজিদ রোডের রায়েরবাজারে বধ্যভূমিতে ১৪ তারিখে ধরে নিয়ে যাওয়া বুদ্ধিজীবীদের গলিত লাশ পাওয়া যায়। রুমির দেহ সেখানে বা অন্য কোথাও পাওয়া যায়নি।
আরও পরে তিনি ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির প্রধান হয়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে সোচ্চার হন। সেই সময় বিএনপি সরকারের সঙ্গে জোটবদ্ধ কয়েকটি দলের মানুষেরা ওঁর নাম বিকৃত করে বলত ‘জাহান্নামের ইমাম’। এসবে ওঁর কিছুই যেত-আসত না। তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন এবং কখনো লক্ষ্যভ্রষ্ট হননি। যদিও অজান্তে তখন তাঁঁর দেহে মরণব্যাধি ক্যানসার বাসা বেঁধেছে।
যাই হোক, ফিরে যাই আবার ওই বইটির কথায়। কীভাবে আবেগবর্জিত ভাষায় একেকটি দুঃখের দিনের কথা লিখে যাচ্ছেন লেখক যে পাঠকের পক্ষে আশ্চর্য হওয়া ছাড়া আরও কিছু করার থাকে না। একটি দিনের বর্ণনা এ রকম, ‘১৪ই ডিসেম্বর, মঙ্গলবার ১৯৭১: শরিফকে বাসায় আনা হয়েছে সকাল দশটার দিকে। মঞ্জুর, মিকি… এরা দু’জন ওদের পরিচিত ও আত্মীয় পুলিশ অফিসার ধ’রে গাড়িতে আর্মড পুলিশ নিয়ে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে একটা পিকআপ যোগাড় করে হাসপাতাল থেকে ওকে নিয়ে এসেছেন।
‘সকাল বেলা প্লেনের আনাগোনা একটু কমই ছিল। আজ কারফিউ ওঠে নি। তবু আমাদের গলিটা কানা বলে, খবর পেয়ে সব বাড়ির লোকেরা এসে জড়ো হতে পেরেছেন। খবর পেয়ে আনোয়ার তার বোর্ড অফিসের মাইক্রোবাসটা অনেক ঝঞ্ঝাট করে নিয়ে এসেছে। সঙ্গে এসেছে শেলী আর সালাম। ওই মাইক্রোবাস পাঠিয়ে মা আর লুলুকে আনা হয়েছে ধানমন্ডীর বাসা থেকে। মঞ্জুর তার গাড়িতে কয়েকটা ট্রিপ দিয়ে এনেছেন বাঁকাকে, ফকিরকে, আমিনুল ইসলামকে। ডব্লিউ আর খান যোগাড় করে দিয়েছেন…’
এ পর্যন্ত বোঝাই যাচ্ছে না যে মৃত শরিফকে আনা হয়েছে, না জীবিত কিন্তু অসুস্থ শরিফকে আনা হয়েছে। এমন নির্মোহ ভাষায় লেখা বইটি। সত্যিকার বলতে গেলে মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস আমরা যারা দেশে ছিলাম, ভারতে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যোগ দিতে পারিনি, প্রতিদিন মধ্যরাতে দরজায় কড়া নাড়া শোনার ভয়ে কাটিয়েছি, এই বইয়ে আমাদের প্রত্যেকের কথাই বলা হয়েছে।
আজ যাঁরা এই বইটি পড়েননি তাঁদের প্রতি অনুরোধ, রুমির মায়ের এই দিনলিপি পড়ুন—তাহলেই পরিষ্কারভাবে জানতে পারবেন সেদিনের পরিস্থিতি।
Was this review helpful to you?
yes
no
অনেক বেশি আপন... আমার রুমি ভাইয়া
amena mazumder usha Mar 17, 2013
আমি একাত্তর দেখিনি,কিন্তু অনুভব করেছি বিভিন্ন বই-পত্র,চিথি,দলিল পড়ে এবং তার সূচনা হয়েছিল জাহানারা ইমামের 'একাত্তরের দিনগুলি' বইটি পরে।এই বইটি মূলত একটি দিনপঞ্জিকা।তাই এটিকে আরও বেশি আপন লেগেছে।মনে হচ্ছে,এইতো আমার পাশের বাড়ির রুমি ভাইয়া যুদ্ধ করতে গেছেন,আর তাঁর পরম স্নেহময়ী জননী রুমি ভাইয়ের জন্য দিনরাত অপেক্ষা করে চলেছেন-কবে আসবে রুমি,কখন আসবে রুমি??? "একাত্তরের দিঙ্গুল"বইতি একটি ঐতিহাসিক দলিল।ইতিহাস,রাজনীতি,মুক্তির চেতনা প্রভৃতি বিষয়গুলোর সাথে খুব কাছ থেকে ব্যক্তিসত্তার যোগসূত্র স্থাপন করাতা অনেকাংশেই সহজ করে দিয়েছে এই অনবদ্য;(আমার চোখে অমর)বইটি। শিশু কিশোর যুবক যুবতী সকলের চেতনাকে পুনরজাগরনের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করার ক্ষেত্রে এই বইটির গুরুত্ব যুগ যুগ ধরে বেঁচে থাকবে...
আশা কঋ বইটি সবাই পড়বেন...
Was this review helpful to you?
yes
no
Rumi amader ohonker
Md. Ayub Ansary Jan 29, 2013
Jahanara imam k salute and soto salam. Tar Akattorer dinguli boitir jonno. Tar ai boiti nisok dinlipi noy, jatir hridoysobi phute uthese akhane. Jahanara imamer sele rumi amader ohonkar bisesh kore amader moto torunder jonno. Rokomarike thanks tader jonno ami onek valo boi er sondhan peyesi tonmodhe ati best.
Was this review helpful to you?
yes
no
বই পর্যালোচনা
golam mowla Feb 7, 2013
সদ্য এইচ,এস,সি পাশ করা তুখোড় ছাত্র রুমী। উচ্চশিক্ষিত ও ধনী সচ্চল পরিবারে খুব আদরে বড় হওয়া রুমী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার প্রাক্কালে শুরু হয়ে যায় দেশের মুক্তিযুদ্ধ। পাক হায়েনাদের ২৫শে মার্চ কালোরাত্রিতে অতর্কিত হামলায় রাজধানী ঢাকা তার বুকে ধারন করা মানুষসহ জ্বলে-পুঁড়ে ছারখার। বেঁচে থাকা অন্যান্য মানুষদের মত ভয়, ঘৃনা, ক্রোধ, উৎকন্ঠায় দিশেহারা সেও। “দেশকে শত্রুমুক্ত করতে হবে” এমন অনুভূতিতে অনুপ্রানিত হয়ে যুদ্ধে যাবার জন্য মনস্থির করে ফেলেছে রুমী। তবে মা’কে না জানিয়ে কিছু করা যাবে না। মা তাকে ছোটবেলা থেকে শিক্ষা দিয়েছে এমন কিছু না করতে, যা তাদের কাছে লুকাতে হয়। মাকে যুক্তি দিয়ে রাজি করিয়ে তবেই সে যুদ্ধে যাবে। কিন্তু মা এত সহজে রুমিকে যুদ্ধে যেতে দিলে তো! রুমিও নাছোড় বান্ধা ! মাকে তার ইচ্ছে ও যুক্তি দিয়ে হ্যাঁ বলিয়েই ছাড়বে। বিশ্বখ্যাত ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটি আই,আই,টি’তে সেপ্টেম্বর থেকে রুমির ক্লাস শুরু। দেশের অবস্থার কথা ভেবে মা রুমিকে এপ্রিলেই তার ইউনি’তে পাঠিয়ে দেবেন ঠিক করলেন। অন্যদিগে রুমি তার সিদ্ধান্তে অটল। মাকে সে বোঝাল,এখন দেশের বাহিরে গিয়ে চার বছর পর ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে এসে বেশ সুখের জীবন কাটাতে পারে সে।কিন্তু দেশমাতাকে রক্ষা না করার দায়ে সে সারাটা জীবন বিবেকের দংশনে দংশিত হবে। মা,তুমি কি চাও আমি নিজের কাছে অপরাধী হয়ে যাই? মা শুধু নিশ্চুপ হয়ে রুমির কথা শুনে। অবশেষে মাস খানেক পর রুমির ইচ্ছেকে মেনে নিয়ে মা বল্লেন,”যা---দেশের জন্য তোকে কোরবানি করে দিলাম”। ছোট্ট একটা ব্যাগ নিয়ে রুমি চলে যায় ভারতীয় সীমান্ত মেলাঘরে। প্রায় দু’মাস সেখান থেকে যুদ্ধ করে ঢাকাতেই ফিরে আসে “বিচ্চু গেরিলা “ হিসেবে। বন্ধুরাসহ কয়েকটা অপারেশন করে বেশ কিছু হায়েনাদের জাহান্নামে পাঠিয়ে দিয়েছে সে। তার সাহস ও কাজের জন্য বন্ধুদের কাছে হিরো রুমী। অবশেষে এক মধ্যরাতে পুরো বাড়ি ঘিরে বাবা ও ভাইসহ রুমিকে এরেষ্ট করে নিয়ে যায় মিলিটারিরা। হায়েনাদের নির্মম অত্যাচারে শহীদ হয় রুমী। এভাবে একটি টগবগে তরুন ছেলের মুক্তিযুদ্ধে যাওয়াটাকে মূল হিসেবে ধরে সেক্টর ২’তে ঢাকাকেন্দ্রিক গেরিলা তৎপরতার বিবরন দিয়ে সাজানো হয়েছে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের “একাত্তরের দিনগুলি” বইটি। বইটির প্রথম দিগে লেখকের লিখনিতে বেশ মজা পাচ্ছিলাম। মাঝের পৃষ্ঠাগুলোতে রোমাঞ্চিত হয়ে শেষের দিগে ঘটনার বর্ণনায় কান্না ধরে রাখতে পারিনি। একাত্তরের সেই দিনলিপিগুলো জীবন্ত হয়ে আমাকে কাঁদিয়ে গেলো এই ২০১৩’তে। কী এক সম্ভাবনাময় ও সমৃদ্ধ জীবনের আহবানকে পায়ে ঠেলে দেশের জন্য নিজের সবকিছু বিলিয়ে দিলো এই রূমী! যাদের এমন অসামান্য আত্মত্যাগের জন্য আমরা আজ স্বাধীন,স্বাধীনতার যুদ্ধে শহীদ সেই সকল রুমীদের চরনে আবারো হাজার সালাম।
1 of 1 people found this review helpful.  Was this review helpful to you?
yes
no
একাত্তরের দিনগুলি
Arup Debnath May 7, 2012
এই বইটা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের উপর লেখা একটা দিন পঞ্জিকা। ঐ সময়ের আমাদের সোনালি দিনের পর পাকিস্তানি দের অত্যাচার এবং ছেলে হারানর কষ্টই এই বইটা তে ফুটে উঠেছে।
2 of 2 people found this review helpful.  Was this review helpful to you?
yes
no
একাত্তরের দিনগুলি: দগ্ধ ও কোমল মৃত্তিকার ইতিহাস
Maruf Rosul Aug 28, 2012
এক

একটি দিনলিপি।
প্রাত্যহিক জীবনের ভাষায় রচিত।
বাঙালির সর্বশ্রেষ্ঠ এক অর্জনের ইতিহাস এ দিনলিপির বিষয়বস্তু।
এটি কোনো মহাকাব্য নয়; এর অন্তঃস্রোতে যখন তখন শিল্পের মহাবাদল নেমে আসেনি।
তারপরও- এটি সকল মহাকাব্যের অতীত, বান-ভাসানো এক মহার্ঘ শিল্পের প্রণয়োচ্ছ্বাসে ঋদ্ধ, বিদগ্ধ।
বাঙলা ১৩৯২ সনের ফাল্গুন (ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৬) মাসে এটি প্রথম প্রকাশিত হয়; এখনও নতুন।
বৈশাখ, ১৪১৭ সনে প্রকাশিত এর অষ্টাবিঙশতি মুদ্রণের প্রচ্ছদ করেছেন কাইয়ুম চৌধুরী।
রজত জয়ন্তী সঙস্করণটি সন্ধানী প্রকাশনীর প্রকাশ- মূল্য দুইশত সত্তর টাকা।
‘মুক্তিযুদ্ধের সকল শহীদ ও জীবিত গেরিলাদের উদ্দেশে’- উৎসর্গপত্র।
পহেলা মার্চ থেকে সতেরোই ডিসেম্বর পর্যন্ত এখানে লিপিবদ্ধ।
দিনলিপি ছাপিয়ে বইটি হয়ে উঠেছে জাতির হৃদয়ছবি।
শহিদ জননী জাহানারা ইমাম লিখেছেন বইটি।
উনিশশো একাত্তর সালের দিনলিপি।
একাত্তরের দিনগুলি ।

জাহানারা ইমাম জন্মগ্রহণ করেন ৩ মে ১৯২৯ সালে; সুন্দরপুর মুর্শিদাবাদে। দীর্ঘ সময় শিক্ষকতা করেছেন স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে। একজন সাঙস্কৃতিক কর্মী হিসেবে বিভিন্ন সঙগঠনের মধ্য দিয়ে মানুষের মনোজগতে তিনি পৌঁছে দিয়েছিলেন তাঁর অধীত জ্ঞান সম্ভার। বাঙালির মুক্তিযুদ্ধে তিনি বাঙলার হাজার মায়ের মতো তাঁর শ্রেষ্ঠ ত্যাগটি স্বীকার করেছেন- সন্তানকে পাঠিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে, আর ফেরেনি সন্তান- শহিদ হয়েছেন রুমী; আমাদের চেতনার আকাশ শহিদ জননী জাহানারা ইমাম । নিটোল ব্যক্তিত্বের সাথে নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা আর চিন্তার সুরসুতার মণিকাঞ্চনে জাহানারা ইমামের সাহিত্য মূর্ত হয়ে ওঠে। গজ কচ্ছপ, সাতটি তারার ঝিকিমিকি, নিঃসঙ্গ পাইন, ক্যান্সারের সঙ্গে বসবাস, প্রবাসের দিনগুলি, অন্য জীবন প্রভৃতি গ্রন্থগুলো তাঁর সাহিত্যপ্রতিভার উজ্জ্বল ও বর্ণিল সাক্ষর। তবে যে গ্রন্থটিতে তিনি হৃদয়কে পাথর করেছিলেন, বুকের গহীনে বহন করা বেদনাকে সঙহত করে দুঃখের নিবিড় অতলে ডুব দিয়েছিলেন আর তুলে এনেছিলেন বিন্দু বিন্দু মুক্তোদানার মতো অভিজ্ঞতার সকল নির্যাস- সেই ‘একাত্তরের দিনগুলি’ একদিকে যেমন বাঙালির মহাকাব্যিক মুক্তিযুদ্ধের এক অনন্য-অসামান্য দলিল, তেমনি বাঙলা সাহিত্যের এক বিজয়তোরণ। এ গ্রন্থে একদিকে যেমন রয়েছে তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থার চিত্র, পারিবারিক সৌহার্দ্যরে বহমানতা, ইতিহাসের আকাশছোঁয়া সৌধ- তেমনি মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে ব্যক্তির অবস্থান চিহ্নিতকরণও এ গ্রন্থের একটি উল্লেখযোগ্য দিক। উনিশশো একাত্তর সালের মার্চ মাস থেকে পাকিস্তান সরকারের ষড়যন্ত্র, সাতই মার্চের উত্তাল জনতরঙ্গের আঁচড়, তেইশে মার্চ প্রতিরোধ দিবসে একটি পারিবারিক আবহের প্রেক্ষিতে গোটা জাতির অবস্থার সত্য-অবলোকন, পঁচিশে মার্চে পাকিস্তানি বাহিনীর চালানো নারকীয় গণহত্যা, তৎকালীন গণমাধ্যমের সত্য-অসত্য সঙবাদ পরিবেশন, বাঙালির প্রবাদপ্রতিম প্রতিরোধ, কোজাগরী পূর্ণিমার পূর্ণ শারদচন্দ্রের দ্যুতির মতোন একজন বঙ্গবন্ধু, সেক্টর টু- ঈশ্বরের মতো খালেদ মোশাররফ, মায়াময়ী রঙধনুর প্রহেলিকার মতো গেরিলা বাহিনী, স্বাধীন বাঙলা বেতার কেন্দ্র, স্বাধীনতার বিরোধী শক্তি- রাজাকার-আলবদর-আলশামস, বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড, সাতকোটি বিপন্ন কোকিলের ঐকতানে ইতিহাস কাঁপানো মহামহীরূহ বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ এবঙ তারপর সবকিছু ছাপিয়ে এবঙ সাথে নিয়ে একজন রুমী উঠে আসেন আমাদের বুকের আঙিনায়- দুইশত সত্তর পৃষ্ঠার এই বইটিতে জাহানারা ইমামের ইতিহাস-কথন চৌরাসিয়ার বাঁশির মতোন আমাদের ঘিরে রাখে, আমাদের বাঁচিয়ে রাখে।

দুই

একটি পারিবারিক ঘটনা পরিক্রমার মধ্য দিয়ে বইটি শুরু হয়, এবঙ ধীরে ধীরে তা প্রবেশ করে ইতিহাসের আলোকোজ্জ্বল গহবরে। পহেলা মার্চ, উনিশশো একাত্তর- সোমবার; এখন থেকেই বইটির শুরু। শুরুর বাক্যে আমরা যাঁকে পাই- রুমী- এরপর পুরো গ্রন্থেই রুমী জীবন্ত থাকেন, যেমন আছেন এখনও এবঙ থাকবেন অনন্তকাল। গ্রন্থটির প্রথম বাক্য-

আজ বিকেলে রুমী ক্রিকেট খেলা দেখে তার বন্ধুদের বাসায় নেয় আসবে হ্যামবার্গার খাওয়ানোর জন্যে।
(পৃষ্ঠা ১১)



বস্তুত সেজন্যেই জাহানারা ইমাম গিয়েছিলেন জিন্না এভিনিউয়ের- যা এখন বঙ্গবন্ধু এভিনিউ- পূর্ণিমা স্ন্যাক্সবারে। এই স্ন্যাক্সবারটি এখনও আছে। বইয়ের শুরুতেই বাঙালির প্রতিরোধ আন্দোলনের একটি গার্হস্থ্য চিত্র পাই। রাজপথে আন্দোলন চলছে, চলছে স্বাধীন বাঙলার পতাকা উত্তোলনের কাজ- এবঙ এরই মাঝে একজন জাহানারা ইমাম- একজন মা, একজন স্ত্রী, একটি পরিবারের কর্ত্রী- তিনি দুই সপ্তাহ ধরে খুঁজে ফিরছেন পূর্ব পাকিস্তানের তৈরি সাবান, তেল, টুথপেস্ট, বাসন-মাজা পাউডার এবঙ আক্ষেপ নিয়ে বলেছেন ‘কিন্তু পাই না’। এই বোধটিও বাঙালির স্বাধীনতার আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক- যদিও অনেক অর্বাচীনের দৃষ্টিতেই এটি ছোটো মনে হতে পারে। এর ফলাফল কতোদূর ছিলো- সেটাও প্রথমদিকেই খুঁজে পাওয়া যায়। জাহানারা ইমাম লিখেছেন-

একমাত্র ইভা বাসন মাজা পাউডারটাই এখানকার তৈরি.. ..পিয়া নামের এক ঢাকাই টুথপেস্ট বাজারে বের হবো হবো করে এখনও বের হতে পারছে না, আল্লাহই মালুম কি কঠিন বাধার জন্য!
(পৃষ্ঠা ১১)



অর্থাৎ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে একটি স্বনির্ভরতার সাহসী পদক্ষেপ গৃহীত হচ্ছিলো, এবঙ এটাও স্পষ্ট যে- পশ্চিম পাকিস্তানি বর্বর শাসকগোষ্ঠী তাতে ভীত সন্ত্রস্ত ছিলো। তাই ‘কঠিন বাধা’ দিয়ে তারা স্বাধীনতার স্বপ্নের মূলোৎপাটন করতে চেয়েছিলো।

পহেলা মার্চে রুমী-জামী স্টেডিয়ামে খেলা দেখতে গিয়েছিলো। সেখান থেকে বাড়ি ফেরে রাত আটটারও পরে। একা। বন্ধুদের নিয়ে নয়- রাষ্ট্রের পরিস্থিতি রুমীকেও ভাসিয়ে নেয়। কিন্তু মা তো ঠিকই সাড়ে চারটার মধ্যে দুই ডজন হ্যামবার্গার বানিয়ে ওভেনে মৃদু গরমে রেখে দিয়েছেন। তাই মায়ের অভিমান হওয়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু রুমীও জানতেন; জাহানারা ইমাম লিখেছেন-

রুমী আত্মরক্ষার ভঙ্গিতে দুই হাত তুলে, মুখে হৃদয় গলানো হাসি ভাসিয়ে.. ..
(পৃষ্ঠা ১২)



তারপর ‘সবকিছুর স্কুপ-নিউজ’ দেবার প্রতিশ্রুতিতে মায়ের অভিমান ভাঙায় রুমী। রুমীর পরিবেশিত ‘স্কুপ-নিউজ’ থেকেই জানা যায় ‘খেই ফুটছে সারা শহরে’ - জানা যায় ‘গুলিস্তানের মোড়ে কামানের ওপর দাঁড়িয়ে মতিয়া চৌধুরী’র আগুনের হলকার মতো বক্তৃতা। রুমী নিজেই বললো-

সাধে কি আর ওঁকে সবাই অগ্নিকন্যা বলে
(পৃষ্ঠা ১২)



এরপর দৈনন্দিন জীবন এগিয়ে যেতে থাকে। আমরা জানতে পারি জাহানারা ইমামের পরিবারের সাথে একজন বিদেশীও থাকতেন। তাঁর নাম কিটি। যদিও দোসরা মার্চেই কিটির প্রসঙ্গ আসে, কিন্তু তাঁর পরিচয় পাওয়া যাবে পাঁচ মার্চ, শুক্রবারের দিনলিপি থেকে। জাহানারা ইমাম লিখছেন-

কিটি আমেরিকান মেয়ে- একটা স্কলারশিপ নিয়ে এদেশে এসেছে ডিসেম্বরে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে মুনীর চৌধুরীর আন্ডারে ‘সমাজ-ভাষাবিজ্ঞানে বাংলার মান নির্ধারণ’ বিষয়ে গবেষণা করার জন্যে। ন’টা ভাষা জানে। বাংলা ভাঙা ভাঙা বলতে পারে। তাড়াতাড়ি বাংলা শেখার জন্যে কোনো বাঙালি পরিবারে বাস করার ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলো কিটি।
(পৃষ্ঠা ১৮)



এই বক্তব্য থেকে দুটো বিষয় নির্ধারণ করা যায়- একটি প্রাসঙ্গিক, অন্যটি অপ্রাসঙ্গিক। প্রাসঙ্গিক বিষয়টি হলো- মুনীর চৌধুরী কোন মানের শিক্ষক ছিলেন- তা তাঁর জীবনী বা রচনা পড়লেই বোঝা যায়- কিন্তু তিনি কতোটা আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষক ছিলেন- তার একটি নিদর্শন এই কথাগুলো। যেসব মূর্খ এবঙ ‘টোকাই গবেষক’ দের কেউ কেউ মনে করে বাঙলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কোনো মেধাবৃত্তিক উপযোগী ভূমিকা রাখেনি - তাদের এই বইটি কয়েকশবার পড়া উচিত।

আল-বদরের অমানুষগুলো এই মহান শিক্ষক মুনীর চৌধুরীকে হত্যা করে- চৌদ্দই ডিসেম্বর, উনিশশো একাত্তর সালে। আর অপ্রাসঙ্গিক বিষয়টি হলো- আজকাল প্রায়শ আলোচনাতেই দেখা যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মান নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। এটা সত্য- মান নিন্মমুখী ; তবে এটাও মানতে হবে- যে বিশ্ববিদ্যালয় বা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিগত চল্লিশ বছরে অধ্যাপক মুনীর চৌধুরীর মতো কোনো শিক্ষক তৈরি করতে পারেনি- তাদের সুউচ্চ বোধসম্পন্ন শিক্ষার্থী আশা করাটা বাতুলতা মাত্র। বিষয়টি অপ্রাসঙ্গিক হলেও ‘একাত্তরের দিনগুলি’ গ্রন্থের বিবেচনায় এড়িয়ে যাবার নয়। ছয় মার্চে জাহানারা ইমাম লিখেছেন-

রুমী গতবছর আই.এস.সি পরীক্ষা দেবার পর থেকে শরীফের অফিসে টুকটাক ড্রইং এর কাজ করে। .. ..রেজাল্ট বের হবার পর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হয়েছে গত বছর অক্টোবরে.. ..বিভাগীয় প্রধানের বিশেষ অনুমতি নিয়ে সে বিশ্ববিদ্যালয়ে ইকনমিকস বিভাগে ক্লাশও করে।
(পৃষ্ঠা ২০)



এই বিষয়টি এখন একেবারেই অসম্ভব। বর্তমান বাস্তবতা এমন নিষ্ঠুর যে- এখানে আন্তঃবিভাগীয় স্নাতোকোত্তর করাও সম্ভব না। অতএব যায় দিন ভালো, আসে দিন খারাপ। আমাদের স্বার্থপর মনন কেবল আমরাই গঠন করছি না- আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও দায়ী- মানতে হবে।

মুক্তিযুদ্ধ পূর্ব সময়ে বাঙালির প্রস্তুতির বেশ কয়েকটি ধাপ উঠে আসে গ্রন্থের মার্চের দিনগুলোর স্মৃতিচারণে। ঊনিশ মার্চের দিনলিপি থেকে জানা যায়- একটি অভিনব স্টিকারের কথা। ‘একেকটি বাংলা অক্ষর একেকটি বাঙালির জীবন’। স্টিকারটি পরিকল্পনা ও ডিজাইন করেছিলেন পটুয়া কামরুল হাসান (২ ডিসেম্বর, ১৯২১ - ২ ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৮)। তিনি ‘বাংলার পটুয়া সমাজ’ বলে একটি সমিতিও গঠন করেন- যাঁরা শাপলা ফুলকে সঙগ্রামী বাঙলার প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করবার প্রস্তাব দেয়।

স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রস্তুতিপর্বকে তুঙ্গে তুলে দেয় ঢাকা টেলিভিশন। তখন এর দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন শিল্পী মোস্তফা মনোয়ার (জন্ম: ১ সেপ্টেম্বর, ১৯৩৫)। তেইশে মার্চের প্রতিরোধ দিবসে একটি অবিস্মরণীয় প্রতিবাদ হয় তাঁর নেতৃত্বে। রাত সাড়ে নয়টার মধ্যেই টেলিভিশনের অনুষ্ঠান শেষ হবার কথা থাকলেও- সেদিন অনুষ্ঠান চলে চব্বিশ মার্চের প্রথম প্রহর পর্যন্ত। জাহানারা ইমাম লিখেছেন এর পেছনের কারণটি।

.. ..আজ দেখি মহোৎসব চলছে তো চলছেই। সুকান্তের কবিতার ওপর চমৎকার দুটো অনুষ্ঠান হলো। একটা- ‘ছাড়পত্র’, মোস্তফা মনোয়ারের প্রযোজনা। ডঃ নওয়াজেশ আহমদের ফটোগ্রাফির সঙ্গে কবিতার আবৃত্তি। আরেকটা- ‘দেশলাই’, বেলাল বেগের প্রযোজনা। সুকান্তের দেশলাই আবৃত্তির সঙ্গে সঙ্গে টিভি পর্দায় দেখা গেল অসংখ্য দেশলাইয়ের কাঠি একটার পর একটা জ্বলে উঠছে।.. ..এরপর শুরু হলো আবদুল্লাহ আল মামুনের এক নাটক- ‘আবার আসিব ফিরে’। .. ..নাটক ২৩ মার্চের রাত পৌনে এগারোটায় শুরু হয়ে শেষ হয় ২৪ মার্চের প্রথম প্রহরে। রাত বারোটা বেজে নয় মিনিটে ঘোষক সরকার ফিরোজ উদ্দিন সমাপনী ঘোষণায় বলেন- এখন বাংলাদেশ সময় রাত বারোটা বেজে নয় মিনিট- আজ ২৪ শে মার্চ বুধবার। আমাদের অধিবেশনের এখানেই সমাপ্তি। .. ..এতক্ষণে রহস্য বোঝা গেল। ২৩ মার্চ প্রতিরোধ দিবসে বীর বাঙালিরা টেলিভিশনের পর্দায় পাকিস্তানের পতাকা দেখাতে দেয়নি।
(পৃষ্ঠা ৩৬)



এ এক অবিস্মরণীয় প্রতিবাদ- মুক্তিযুদ্ধ কোনো বিছিন্ন ঘটনা নয়, একটি সুদীর্ঘ আন্দোলনের ফসল আর সে আন্দোলনের রশ্মি ছড়িয়েছিলো চারদিকে, স্পর্শ করেছিলো সমস্ত আকাশ। এ আন্দোলন ছিলো সর্বস্তরের জনগণের আন্দোলন- অধিকারের আন্দোলন। মার্চের অধ্যায়গুলোতে যদিও পাকিস্তানি বর্বর সরকারের ক্ষমতা হস্তান্তরের টালবাহানার ইতিহাস বিধৃত হয়েছে, তবে যেহেতু দিনলিপি- সেহেতু ইতিহাসের সাল-তারিখ ধরে তা হয়তো আসেনি। কিন্তু বাঙালির স্বাধীনতার প্রস্তুতিপর্বকে যে পাকিস্তানি বর্বর সেনাবাহিনী নানাভাবে প্রতিহত করতে চেয়েছে তার একটি ছোটো কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ ইঙ্গিত পাওয়া যায় বাইশে মার্চের লেখায়। জাহানারা ইমামের জীবনসঙ্গী শরীফ ইমামের উদ্ধৃতি দিয়ে লেখক লিখেছেন-

মিরপুরে, চট্টগ্রামে, পার্বতীপুর-সৈয়দপুরে বাঙালি বিহারী খুনোখুনি রক্তারক্তি হচ্ছে- সেনাবাহিনী বিহারিদের উস্কানি আর সাপোর্ট দিচ্ছে।
(পৃষ্ঠা ৩৪)



পঁচিশে মার্চ তারিখের নৃশঙস গণহত্যার বিবরণ ছাব্বিশ মার্চ, শুক্রবার থেকে একত্রিশ মার্চ, বুধবার পর্যন্ত লেখাগুলোতে। সেখানে কামাল আতাউর রহমান নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাঙলা বিভাগের এক স্নাতক পরীক্ষার্থীর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা বর্ণনা গা শিউরে উঠার মতো। উল্লিখিত শিক্ষার্থী মোহসীন হলের আবাসিক ছিলো- তাঁর জবানিতে জাহানারা ইমাম তুলে ধরেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গণহত্যার বর্ণনা- তবে বিশদ অর্থে নয়। তবে ছাব্বিশে মার্চে লেখার একেবারে শেষ দুটো লাইনেই নৃশঙস গণহত্যার তীব্রতা লক্ষ্যণীয়।

আবার আমরা সবাই নিচে নামলাম। দরজা খুলে উঠানে নেমে মিকির জায়গায় গিয়ে দাঁড়ালাম। মোমবাতির কাঁপা কাঁপা আলোয় দেখলাম মিকি মরে পড়ে আছে।
(পৃষ্ঠা ৪২)



মিকি তাঁদের গৃহপালিত কুকুরের নাম। একটি পশু- সেও সহ্য করতে পারেনি পঁচিশে মার্চের রাতের ভয়াবহতা। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে পশু বললেও- প্রাণীজগত লজ্জা পাবে।

তিন

দিনলিপির এপ্রিল থেকে জুলাই পর্যন্ত অঙশে মুক্তিযুদ্ধের এক অবিনাশী তীব্রতা ধরা পড়ে। সেই থাকে উঠে আসে বিভিন্ন গণমাধ্যমের অপপ্রচার- নানা বিভ্রান্তির চিত্রও। চৌদ্দ এপ্রিলের লেখার শুরুটা বেশ চমকপ্রদ।

রুমীর খুব মন খারাপ।
(পৃষ্ঠা ৬১)



কেনো মন খারাপ- সে আলোচনা জাহানারা ইমাম করেছেন, কিন্তু তার আগে রুমীর মনন বোধ ও পড়াশুনার একটি চিত্র উঠে এসেছে। রুমী আই.এস.সি পরীক্ষার পর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলো। সে হিসেবে তাঁর বয়স সহজেই অনুমেয়। কিন্তু এ সময়টাতেই তাঁর একটি দাঢ্য ব্যক্তিত্ব ও বোধ তৈরি হয়েছিলো। এর পেছনের কারণটি ছিলো তাঁর পড়াশুনা। জাহানারা ইমাম দশ মার্চে লিখেছেন-

রুমীদের আলাপ-আলোচনার পরিধির মধ্যে পড়ে কার্ল মার্কস, এঙ্গেলস, লেনিন, মাও-সে-তুং।
(পৃষ্ঠা ২৫)



কেবল পড়াই নয়- তাঁর ধারণ ক্ষমতা ও বিচক্ষণতাও ছিলো প্রশঙসনীয়। জাহানারা ইমামের নন্দাই একরামের সঙ্গে তাঁর আলোচনাই সে স্বাক্ষ্য বহন করে। বাইশে মার্চে আমরা পাই-

.. ..এই বয়সে এমন মাথা, এমন ক্লিয়ার কনসেপশান, বাউরে, আমি তো আর দেখি নাই।
(পৃষ্ঠা ৩৩)



বস্তুত সে কারণেই রুমীর মধ্যে একটি দূরদর্শিতা তৈরি হয়েছিলো; পঁচিশে মার্চের সকালে রুমীর সঙ্গে লেখকের আলাপচারিতায় আমরা দুটো বিষয় পাই।

আম্মা বুঝতে পারছ না মুজিব-ইয়াহিয়া আলোচনা ব্যর্থ হতে বাধ্য। এটা ওদের সময় নেবার অজুহাত মাত্র। ওরা আমাদের স্বাধীনতা দেবে না। স্বাধীনতা আমাদের ছিনিয়ে নিতে হবে সশস্ত্র সঙগ্রাম করে।
.. ..
তাহলে এখন উপায়?

উপায় বোধ হয় আর নেই আম্মা।
(পৃষ্ঠা ৩৭)



উপায় সত্যিই ছিলো না। পাকিস্তানি বর্বর বাহিনীর চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধে বাঙালি প্রতিহত করে। মুক্তিযুদ্ধ হয় সে যুদ্ধের নাম। সে যুদ্ধে রুমীও একজন যোদ্ধা- বীর মুক্তিযোদ্ধা। রুমী তাঁর নিজের দুটো পরিচয় দিয়ে গেছে। একটি হলো সাতই মার্চের ভাষণের পর বাসায় এসে তাঁর বক্তব্যে-

আমি কোনো দলভুক্ত নই, কোনো রাজনৈতিক দলের শ্লোগান বয়ে বেড়াই না। কিন্তু আমি সাধারণ বুদ্ধিসম্পন্ন, মান-অপমান জ্ঞানসম্পন্ন একজন সচেতন মানুষ।
(পৃষ্ঠা ২৩)



তাঁর অন্য পরিচয়টি লেখার শেষের জন্যে তোলা রইলো।

এই রুমী- সচেতন বোধ সম্পন্ন এক তরুণ; তাঁর মন খারাপের কথা আমরা জানতে পারি চৌদ্দই এপ্রিলে। এর কারণ হলো- চীন পাকিস্তানকে দৃঢ় সমর্থন দিয়েছে। লেখক লিখেছেন-

চৌ এন লাই ঘোষণা করেছেন: স্বাধীনতা রক্ষার জন্য চীন সরকার পাকিস্তানকে পূর্ণ সহযোগিতা দেবে। .. ..প্রাণের বন্ধু বিপদের মুহূর্তে চরম বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।
(পৃষ্ঠা ৬১-৬২)



মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে চীন সরকারের ভূমিকা সবারই জানা- ইতিহাসেও লিপিবদ্ধ আছে। যদিও সেই বিশ্বাসঘাতক চীনের দালাল-মুরিদরা এখনও চৈনিক বাতাসে গা এলিয়ে দেয়।

একই দিনের লেখায় জাহানারা ইমাম আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের অবতারনা করেছেন। দালালের প্রসঙ্গ যখন এসেই পড়লো, সেটিও আলোচনা হয়ে যাক-

.. ..তিন চারদিন আগে ঢাকায় এক নাগরিক শান্তি কমিটি গঠিত হয়েছে। কাগজে খুব ফলাও করে খবর ছাপা হচ্ছে। খাজা খায়রুদ্দিন এর আহবায়ক। সদস্য ১৪০ জন। তার মধ্যে স্বনামধন্য হচ্ছেন আবদুল জব্বার খদ্দর, মাহমুদ আলী, ফরিদ আহমদ, সৈয়দ আজিজুল হক, গোলাম আযম।
(পৃষ্ঠা ৬২)



তবে দালালদের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে একটি চমৎকার অঙশ চোখে পড়বে আটাশ এপ্রিলের লেখার একেবারে শেষ অনুচ্ছেদে।

.. ..আজ বিকেল চারটার সময় শান্তি কমিটির অন্যতম সদস্য জনাব আবদুল জব্বার খদ্দর বক্তৃতা দিচ্ছিলেন। শ্রোতামণ্ডলী: তিনটি ট্রাফিক পুলিশ, একটি মিলিটারি পুলিশ এবং একটি আর্মি জওয়ান।
(পৃষ্ঠা ৭০)



রুমীর মুক্তিযুদ্ধে যাবার বিষয়ে জাহানারা ইমাম সম্মতি দেন একুশ এপ্রিল। তিনি লিখেছেন-

.. ..দিলাম তোকে দেশের জন্য কোরবানি করে। যা, তুই যুদ্ধে যা।
(পৃষ্ঠা ৬৬)



এরপর মন্ত্রের মতো করে আমরা পড়ে যাই কয়েকটি তারিখের দিনলিপি- আমাদের সামনে আসে লিয়ন উরিস এর লেখা ‘মাইলা-১৮’ আর কাহলিল জিবরানের ‘প্রফেট’ কবিতার অঙশ- যা বনি প্রিন্সের মতো প্রস্ফুটিত হয়ে আছে তেসরা মে- এর দিনলিপিতে।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির উপর কী অবর্ণনীয় নির্যাতন হয়েছে- তা ‘একাত্তরের দিনগুলি’র পাতায় পাতায় উঠে এসেছে। বিশেষ করে জুলাই মাসের দিনলিপিগুলোতে মানবিক কষ্টের এক অসহ্য চিত্র উঠে আসে। সাত জুলাই তারিখের দিনলিপি পাঠে আমরা জাহানারা ইমামের জীবনসঙ্গী শরীফ ইমাম ও তাঁর বন্ধু বাঁকার দুঃসাহসিক অবদানের চিত্র পাই। সেক্টর কমান্ডার খালেদ মোশাররফের অনুরোধেই সারা দেশের সবগুলো ব্রিজ কালভার্টের তালিকা বানানোর কাজ হাতে নেন তাঁরা। সেই সঙ্গে এগুলো ওড়ানোর ব্যাপারে কতোগুলো তথ্য। এখানে লক্ষ্য করতে হবে- মুক্তিযোদ্ধারা কেবল মুক্তিযুদ্ধই করেননি, স্বাধীনতার দুর্বার স্বপ্নকে তাঁরা বাস্তবতার ফ্রেমে বাঁধিয়েছিলেন। সে কারণেই তেসরা জুলাইয়ের লেখায় পাই-

.. .ব্রিজের কোন কোন পয়েন্টে এক্সপ্লোসিভ বেঁধে ওড়ালে ব্রিজ ভাঙবে অথচ সবচেয়ে কম ক্ষতি হবে অর্থাৎ দেশ স্বাধীন হবার পর খুব সহজে মেরামত করা যাবে.. ..
(পৃষ্ঠা ১২৪)



মুক্তিযুদ্ধের একচল্লিশ বছর পর প্রায়শই একটি প্রশ্ন মনে জাগে- পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী না হয় অন্ধ-বর্বর; কিন্তু সেখানকার সাধারণ জনগণ- তারা তো পারতো একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর এই বর্বর হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ করতে। আজকাল অনেকের কণ্ঠে ও কলামে অতীত ভুলে যাবার কুৎসিত নিনাদ বাজে- কিন্তু একটি প্রশ্নের উত্তর তারা এড়িয়ে যায়। যে মুক্তিযুদ্ধ সারাবিশ্বে আলোড়ন তৈরি করেছিলো, বিশ্ব গণমাধ্যমে যে গণহত্যার তীব্র নিন্দা হয়েছিলো- পাকিস্তানি জনগণ তা জেনেও কেনো প্রতিবাদ করলো না? এর উত্তর হলো- পাকিস্তানি জনগোষ্ঠীর ন্যাক্করজনক মানসিকতা এবঙ হীন মনোবৃত্তি। এরা মূলত অশিক্ষিত এবঙ অধিকাঙশই শিক্ষিতরাই খুব নিম্নমানের শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে শিক্ষা অর্জন করেছে। ‘একাত্তরের দিনগুলি’তে আমরা পাই-

.. ..ও দিকের (পশ্চিম পাকিস্তানের) লোকেরা কি বি.বি.সি, ভয়েস অব আমেরিকা, রেডিও অস্ট্রেলিয়া এসব শোনে না?
শোনে, কিন্তু বিশ্বাস করে না। ওরা সরকারের ছেলে ভুলানো ছড়া শুনেই সন্তুষ্ট
(পৃষ্ঠা ১৩৪)



চার

আগস্ট থেকে ডিসেম্বরের দিনলিপিগুলো একই সঙ্গে প্রগাঢ় বেদনা ও মহিমান্বিত বিজয়োল্লাসের দলিল। একাত্তরের নয় আগস্ট ছিলো শহিদ জননী জাহানারা ইমামের চতুর্বিঙশ বিবাহবার্ষিকী। তিনি খুব আশা করেছিলেন সামনের বছরের জন্যে, রজতজয়ন্তী উৎসবটা খুব ধুমধাম করে পালন করবার প্রত্যাশায় তিনি সেদিনের দিনলিপি লিখেছিলেন। কিন্তু ওই যে- ট্র্যাজিডি ছাড়া মহাকাব্য হয় না; তাই আর জানা হয়নি- রজতজয়ন্তীর উৎসবটা তিনি করেছিলেন কি না। কতোটা কান্নায় তিনি স্মৃতিচারণ করেছিলেন শরীফ ইমামের?

মেলাঘরে মুক্তিযোদ্ধাদের দিনগুলোর এক নিটোল বর্ণনা পাওয়া যায় বিশ আগস্টের লেখায়। সেখানেই রুমীর বক্তব্য থেকে উঠে আসে কণ্ঠশিল্পী আজম খানের কথা। এক ভীষণ সাহসী গেরিলা যোদ্ধা আজম খান ও তাঁর উদাত্ত কণ্ঠের গান- ‘একাত্তরের দিনগুলি’ গ্রন্থের মাধ্যমে আমাদের সামনে আসে নতুন এক ছবি হয়ে- কিঙবদন্তীর মতো। আগস্টের লেখাগুলোতে আমরা রুমীদের গেরিলা অপারেশনের ইতিহাস জানি- আবার মনে পড়ে শামসুর রাহমানের ‘গেরিলা’ কবিতাটির শেষ পঙক্তি-

তুমি তো আমার ভাই, হে নতুন সন্তান আমার।



রুমী ধরা পড়ে উনত্রিশ আগস্টে, সেদিন রবিবার ছিলো। যার নেতৃত্বে ‘রুটিন সার্চ’ এর কথা বলে রুমী-তাঁর বাবা শরীফ ইমাম- তাঁর অনুজ জামীর সাথে মাসুম ও হাফিজ নামের দুজন আত্মীয়কে ধরে নিয়ে যায় বর্বর পাকিস্তানি বাহিনী, তার নাম ক্যাপ্টেন কাইয়ুম। তারপর গাড়ির হেডলাইট জ্বালিয়ে রুমীকে আলাদা করে নেয় পাকিস্তানি বর্বর সেনাবাহিনী। একত্রিশে আগস্ট ফেরত আসে সবাই- কেবল রুমী আসেনি।

সেনাবাহিনীর নির্যাতনের মুখেও কী অটল দৃঢ় ছিলো রুমী ও তাঁর সহযোদ্ধারা, তার একটি সাহসী আখ্যান ‘একাত্তরের দিনগুলি’। তবে এই আখ্যান কেবল রুমী ও তাঁর সহযোদ্ধাদের ঘিরে আবর্তিত হলেও এ দৃশ্য ছিলো সমগ্র বাঙলার আপামর বীর মুক্তিযোদ্ধাদের। জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান- রক্তজবার মতো একাত্তরের বীর মুক্তিযোদ্ধারা প্রত্যেকেই অজেয় সাহসের অনিন্দ্য সমার্থক। পহেলা সেপ্টেম্বরের লেখাটি বন্দী-নির্যাতনের দলিল- একেবারে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার আলোক প্রতিলিপি যেনো। সুরকার শহিদ আলতাফ মাহমুদকে তুলে নিয়ে যাবার ইতিহাসও পহেলা সেপ্টেম্বরের দিনলিপিতে জীবন্ত। ‘স্টেটম্যান্ট’ নেবার নাম করে পাকিস্তানি বর্বর বাহিনীর নৃশঙস অত্যাচারের মাঝেও বাঙালি ছিলো অটল, ছিলো শাশ্বত সৌহার্দ্যরে ছায়া। পহেলা সেপ্টেম্বরের দিনলিপিতেই পাই-

মেঝেয় মরার মতো ঘুমোনো লোকগুলো হঠাৎ সবাই একসঙ্গে উঠে বসে, হৈ হৈ করে নতুন বন্দীদের নাম, কুশল জিজ্ঞেস ক’রে সেবা-যত্ন করা শুরু করে দেয়। কার কোথায় ভেঙেছে, কোথায় রক্ত পড়ছে, কোথায় ব্যথা- খোঁজ নিয়ে কাউকে ব্যান্ডেজ করে, কাউকে ম্যাসাজ করে, কাউকে নোভালজিন খাওয়ায়। প্রথম চোটে সবাইকে পানি খাওয়ায়। যারা সিগেরেট খায় তাদের সিগেরেট দেয়।
(পৃষ্ঠা ১৯২)



চার সেপ্টেম্বর, শনিবারের লেখায় আমরা পাই বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের (মূল গ্রন্থে বানান লেখা হয়েছে মতিয়ুর রহমান) ইতিহাস। একই সঙ্গে এই ঘটনাকে একত্রিশ আগস্টের দৈনিক পাকিস্তান কীভাবে ব্যাখ্যা করেছিলো- তাও উল্লেখ আছে। পাকিস্তানের বর্বর সরকার মতিউর রহমানকে বিশ্বাসঘাতক বলেছিলো- এই প্রসঙ্গেই জাহানারা ইমাম লিখেছিলেন-

যদি কোনোদিন পূর্ব বাংলার এই ভূখণ্ড স্বাধীন হয়, তবে মতিয়ুর রহমান- সেই স্বাধীন দেশ নিশ্চয়ই তোমাকে সর্বোচ্চ বীরত্বসূচক খেতাবে ভূষিত করবে।
(পৃষ্ঠা ১৯৯)



বইটি পড়তে পড়তে একটি বিষয় সম্বন্ধে ধারণা পাওয়া যেতে পারে- অন্তত ব্যক্তিগতভাবে আমার সেই ধারণাটিই হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ যতোই বেগবান হচ্ছিলো, মূঢ় শত্রুর ঘাঁটি যতোই গেরিলাদের অভেদ্য লক্ষ্যে চূর্ণ-বিচূর্ণ হচ্ছিলো, ততোই বাঙালির চেতনা ও মনস্তত্ত্ব হয়ে উঠছিলো টনটনে। এর অনেকগুলো প্রমাণই ‘একাত্তরের দিনগুলি’ গ্রন্থে রয়েছে। বিশেষ করে একুশে অক্টোবরে লেখা শেষ অনুচ্ছেদটি তারই চিহ্ন বহন করে-

ফখরুজ্জামানের কেবিনে ঢুকে দেখি ডা. ফজলে রাব্বি তাকে দেখতে এসেছেন। শুনলাম ফখরুকে রাব্বি বলছেন, ‘যান, ভালো হয়ে ফিরে আসুন। এসে দেখবেন আমরা হয়তো অনেকেই নেই’।
(পৃষ্ঠা ২২১)



ঘটেছিলোও তাই- ডা. ফজলে রাব্বিকে আল-বদর বাহিনী হত্যা করে বিজয়ের প্রাক্কালেই।

শহিদ রুমীর পরিবারের দৃঢ়তা এবঙ তাঁর আদর্শের প্রতি সম্মান প্রদর্শন পাঠককে যারপরনাই মুগ্ধ করে। সন্তানের আদর্শের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করেই পাকিস্তানি সরকারের কাছে দয়া প্রদর্শনের আবেদন করেনি রুমীর পরিবার। প্রতিবাদ আর আদর্শের লড়াইয়ের এ এক অবিনশ্বর স্মারক।

শরীফ ইমামের জন্মদিন ছিলো ত্রিশ অক্টোবর। জীবনসঙ্গী জাহানারা ইমাম তাঁকে উপহার দিয়েছিলেন বায়তুল মোকাররমের ফুটপাতের দোকান থেকে সুন্দর চিকন কাজ করা সাদা একটি টুপি আর অন্ধকারে আলোর আভা দেখা যায়- এমন একটি তসবি। কিন্তু জামীর উপহারটা ছিলো অনন্য- ‘বিচ্ছু অ্যাকশানের একটা খবর’।

তেরো ডিসেম্বরের লেখার মাঝামাঝি অঙশে আমরা প্রথম শরীফ ইমামের অসুস্থতার সঙবাদ পাই। আর চৌদ্দ ডিসেম্বরের শুরুর দুটি অনুচ্ছেদেই পাই তাঁর মৃত্যুর সঙবাদ। চারজনের পরিবারের দুজন অনন্তলোকে, বাকি দুজন- মা আর সন্তান রইলেন নতুন বাঙলাদেশকে বরণ করে নেবার জন্যে। তাই সতেরো ডিসেম্বর, শুক্রবারের লেখায় শহিদ জননী লিখছেন-

চুল্লু এতদিন সেন্ট্রাল জেলে ছিল। ওকে জেল থেকে বের করে এনে রুমীর অনুরাগী এই মুক্তিযোদ্ধারা রুমীর মায়ের সঙ্গে দেখা করতে এসেছে।
(পৃষ্ঠা ২৭০)



‘একাত্তরের দিনগুলি’ মুক্তিযুদ্ধের এক কালানুক্রমিক ইতিহাস। ইতিহাসটি রচনা করেছেন এমন একজন- যিনি ও তাঁর পরিবার মুক্তিযুদ্ধের এক সাহসী প্রত্যয়াঙশ। যদিও দিনলিপি- অর্থাৎ ব্যক্তিগত শোকস্মৃতি, তবুও তা অনন্ত হয়ে যেনো জেগে রয়েছে আমাদের সকলের অনুভূতির সঙ্গে। বইটির গ্রন্থস্বত্ব ‘একাত্তরের দিনগুলি’ স্মারক ট্রাস্টের এবঙ আগেই উল্লেখ করেছি অষ্টাবিঙশতি মুদ্রণ (রজতজয়ন্তী সঙস্করণ) থেকে এই আলোচনাটি লেখা হয়েছে।

কেবল ইতিহাসের সত্য নির্যাসটুকু নয়, উপস্থাপনার ধরণেও ‘একাত্তরের দিনগুলি’ সাহিত্যমান সম্পন্ন। বইয়ের বিভিন্ন্ স্থানে ব্যবহৃত বাগধারা-প্রবাদ প্রবচন-পুরাণ নির্ভর শব্দের সার্থক প্রয়োগ তার নমুনা। উদাহরণস্বরূপ-

.. ..বলা যেতে পারে সবে ধন নীলমণি (পৃষ্ঠা ১১)

.. ..পূর্ব পাকিস্তানে ভীমরুলের চাকে ঢিল ছুঁড়েছে (পৃষ্ঠা ১৪)

.. ..দেখছো না, এখন উলট-পুরাণের যুগ চলছে (পৃষ্ঠা ২০)

পড়াশোনা এতদিন শিকেয় তোলা ছিল, এবার টংয়ে উঠল। (পৃষ্ঠা ২০)

ওটা থাকলে লখিন্দরের লোহার ঘর বানিয়েও লাভ নেই (পৃষ্ঠা ৩১)

.. ..আপাতদৃষ্টে মনে হচ্ছে জ্বলন্ত বালিতে খৈ ফুটছে (পৃষ্ঠা ৩৪)

.. ..মাছের মাকে নাকি শোক করতে নেই (পৃষ্ঠা ৮২)

কানু ছাড়া গীত নেই (পৃষ্ঠা ৮৩)

যার কাজ তারে সাজে, অন্য লোকে লাঠি বাজে (পৃষ্ঠা ১০২)

সরু চুলে বাঁধা ডেমোস্থিনিসের খাঁড়া ঝুলছে মাথার ওপর (পৃষ্ঠা ১২৪)

একা রামে রক্ষা নাই, সুগ্রীব দোসর? (পৃষ্ঠা ২৪২)




কয়েকটি স্থানে এর মুদ্রণ প্রমোদ অত্যন্ত অমার্জনীয় মনে হয়েছে। বিশেষ করে যে প্রবাদপ্রতিম মানুষটিকে ঘিরে এই আখ্যান- শহিদ রুমী, তাঁর নামের বানানে কখনো রুমি (পৃষ্ঠা ১৪) আবার কখনো রুমী ব্যবহারটা অবশ্যই দৃষ্টিকটু- যদিও তাঁর নামের সঠিক বানান রুমী। তাছাড়া আরও কয়েকটি স্থানের মুদ্রণ প্রমোদ চোখে পড়ার মতো। উদাহরণস্বরূপ-

শে-াগান- যার সঠিক রূপ ‘শ্লোগান’ (পৃষ্ঠা ১৫)

এতে পানি কেন?- যার সঠিক রূপ ‘এতো পানি কেন?’ (পৃষ্ঠা ৬৭)

এখনো আছে নি- যার সঠিক রূপ ‘এখনো আসে নি’ (পৃষ্ঠা ১১১)

প্রবোধকুমার স্যান্যাালের- যার সঠিক রূপ হবে ‘প্রবোধকুমার স্যান্যালের’ (পৃষ্ঠা ১১২)

উদ্দার- যার সঠিক রূপ হবে ‘উদ্ধার’ (পৃষ্ঠা ১৯৬)

বন্ধু-বান্ধুব- যার সঠিক রূপ হবে ‘বন্ধু-বান্ধব’ (পৃষ্ঠা ২৪৪)



‘ছাপাখানার ভূত’ সম্বন্ধে পাঠক অবশ্যই সচেতন, তবে অষ্টাবিঙশতি মুদ্রণেও যদি এ বিষয়ে সচেতন থাকতে হয়- তবে ভূত তাড়ানো ওঝার বিকল্প দেখা বাঞ্ছনীয়।

পাঁচ

বলেছিলাম- শহিদ রুমীর দুটো পরিচয় তিনি নিজেই দিয়ে গেছেন; প্রথমটি উল্লেখ করা হয়েছে- আর দ্বিতীয়টি পাওয়া যায় ‘একাত্তরের দিনগুলি’ গ্রন্থেই। রুমীর ছবির মাঝে জীবনানন্দ দাশের কবিতার পঙক্তি- আবার আসিব ফিরে.. ..

এই রুমী- তিনি কথা দিয়ে গেছেন, তিনি আবার আসবেন এই বাঙলায়। শহিদ জননী একত্রিশে অক্টোবরের দিনলিপির শেষ লাইনে লিখছেন-

.. ..রুমী নেই, বদি নেই, জুয়েল নেই কিন্তু যুদ্ধ আছে- স্বাধীনতার যুদ্ধ।
(পৃষ্ঠা ২৩২)



এই স্বাধীনতা যুদ্ধের অমোঘ বলয়েই দৃঢ় সঙগ্রামের প্রতীক হয়ে আছেন মুক্তিযোদ্ধারা; আর তাঁদের বিস্ময়কর অবদানে ঋদ্ধ হয়ে আছে আমাদের বাঙলাদেশ।

‘একাত্তরের দিনগুলি’ আমার সবচেয়ে প্রিয় বইগুলোর একটি। আমি আমার সাধ্যের সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করেছি এর আলোচনাটি লিখবার। বস্তুত সে কারণেই- লেখাটি দীর্ঘ হয়েছে। একাত্তর সালে সাতকোটি বাঙালির যৌথ খামারে রচিত হয়েছিলো যে মুক্তিযুদ্ধ, আজ দীর্ঘ একচল্লিশ বছর পরও সেই ইতিহাসের কার্নিশেই নিঃশ্বাস নিয়ে বাঁচে ষোলো কোটি বাঙালি এবঙ আগামীতেও বাঙালি বেঁচে থাকবে তার এই ঋদ্ধ ইতিহাসের করতলে। যদি কোনোদিন এই ইতিহাসের সত্যপথ থেকে তার পদস্খলন ঘটে- সেদিনই নিঃশেষ হবে বাঙালি; তাই ‘একাত্তরের দিনগুলি’ আমাদের পথপ্রদর্শক, আমাদের অনুপ্রেরণার অখ- আকাশ।

আমি প্রতীক্ষায় রইলাম- ‘একাত্তরের দিনগুলি’র হীরকজয়ন্তী সঙস্করণ নিয়ে কোনো একটি আলোকোজ্জ্বল মেধাবী আলোচনার নিবিড় সৌন্দর্যে বিলীন হয়ে যাবে আমার এই ব্যর্থ আলোচনাটি।

আমি ব্যর্থতা সেদিন সুখী হবে। সৌন্দর্যে বিলীন হবার চেয়ে সুখ আর নেই।
3 of 3 people found this review helpful.  Was this review helpful to you?
yes
no
Similar Products
জাহানারা ইমাম
Tk. 40.0
Tk. 36.0
জাহানারা ইমাম
Tk. 125.0
Tk. 113.0
জাহানারা ইমাম
Tk. 50.0
Tk. 45.0
জাহানারা ইমাম
Tk. 500.0
Tk. 425.0
জাহানারা ইমাম
Tk. 125.0
Tk. 113.0
জাহানারা ইমাম
Tk. 70.0
Tk. 63.0
জাহানারা ইমাম
Tk. 50.0
Tk. 45.0
জাহানারা ইমাম
Tk. 150.0
Tk. 132.0
জাহানারা ইমাম
Tk. 80.0
Tk. 72.0
জাহানারা ইমাম
Tk. 100.0
Tk. 90.0
Reading List