ড. ইউসুফ আল কারযাভীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বই ‘ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থা : তত্ত্ব ও প্রয়োগ’। বইটির মূল আরবি নাম ‘মিন ফিকহিদ দাওলাহ ফিল ইসলাম’। বইটি পাঁচটি বিস্তৃত অধ্যায়ে বিন্যস্ত।
প্রথম অধ্যায়ে লেখক ইসলামি রাষ্ট্রের গুরুত্ব আলোচনা করেছেন। তিনি প্রথমেই বলেন, পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদ এ কথা মুসলিমদের মনে ঢুকিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে যে, ‘ইসলাম কিছু নৈতিক বিধিবিধান-সংবলিত ধর্মমাত্র। রাষ্ট্র পরিচালনা ও রাষ্ট্রীয় বিধানের সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই। স্থান-কাল-পাত্রভেদে বিদ্যাবুদ্ধি ও অভিজ্ঞতার আলোকে মানুষ রাষ্ট্র পরিচালনার নিয়মনীতি প্রণয়ন করবে; এখানে ধর্মের কোনো স্থান নেই।’ ড. কারযাভী প্রথম অধ্যায়ে কুরআন, ইসলামের ইতিহাস ও ইসলামের প্রকৃতি থেকে ইসলামি রাষ্ট্রের পক্ষে দলিল-প্রমাণাদি পেশ করেছেন।
দ্বিতীয় অধ্যায়ে তিনি দেখাচ্ছেন যে, ইসলামি রাষ্ট্র কোনো থিওক্র্যাসি তথা স্বৈরাচার নেতা বা পুরোহিতশাসিত রাষ্ট্র নয়। এটি একটি নাগরিক ও দেওয়ানি রাষ্ট্র। এটি একটি সাংবিধানিক ও আইনগত রাষ্ট্র। এ রাষ্ট্র রাজতান্ত্রিক নয়; বরং পরামর্শভিত্তিক রাষ্ট্র। ড. কারযাভী বলেন, ইসলামি রাষ্ট্র একটি হিদায়াত ও কল্যাণভিত্তিক রাষ্ট্র। এ রাষ্ট্র অসহায় ও দুর্বলদের আশ্রয়স্থল। এটি স্বাধীনতা ও অধিকার আদায়ের রাষ্ট্র এবং এটি একটি চারিত্রিক ও আদর্শিক রাষ্ট্র।
তৃতীয় অধ্যায়ে তিনি ইসলামি রাষ্ট্রের প্রকৃতি নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং বলেছেন যে, এটি একটি বেসামরিক ও নাগরিক রাষ্ট্র; এটি থিওক্র্যাসি নয়। সেক্যুলারদের দাবি, ‘ইসলাম একটি ধর্মীয় পুরোহিতশাসিত রাষ্ট্রের কথা বলেছে।’ তাদের এই দাবি ও সন্দেহ তিনি শক্তভাবে প্রত্যাখ্যান করেন।
চতুর্থ অধ্যায়ে তিনি ইসলামি রাষ্ট্র সংক্রান্ত বিভিন্ন ভুল চিন্তার অপনোদনের চেষ্টা করেছেন।
পঞ্চম অধ্যায়ে তিনি রাষ্ট্র ও রাজনীতি সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দিয়ে ইসলামি রাষ্ট্রের প্রকৃতি, কর্মপরিধি ও বৈশিষ্ট্যকে স্পষ্ট করেছেন।
রাজনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থা সম্পর্কে আগ্রহী পাঠকদের জন্য একটি অবশ্যপাঠ্য জরুরি বই ‘ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থা : তত্ত্ব ও প্রয়োগ’।
শায়খ প্রফেসর ড. ইউসুফ আবদুল্লাহ আল কারযাভি (১৯২৬-) মিশরীয় বংশোদ্ভূত একজন প্রভাবশালী আধুনিক ইসলামি তাত্ত্বিক ও আইনজ্ঞ। তিনি মুসলিম ধর্মতত্ত্বিকদের অভিজাত সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব মুসলিম স্কলার্সে (International Union of Muslim scholars)-এর সাবেক চেয়ারম্যান। জন্ম ১৯২৬ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর। মিসরের উত্তর নীলনদের তীরবর্তী সাফাত তোরাব গ্রামে। দুই বছর বয়সে বাবা ইন্তিকাল করলে চাচা তার লালন-পালন করেন। দশ বছর বয়সে তিনি সম্পূর্ণ কোরআন হিফজ করেন। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পড়াশোনা করেন আল-আজহার কারিকুলামে। প্রাচীন ইসলামী বিদ্যাপীঠ আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উসুলুদ দ্বীন অনুষদ থেকে অনার্স, আরবি ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিপ্লোমা এবং পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। মিসরের ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অধীন ‘Institute of Imams’ এর পরিদর্শক হিসেবে কর্মজীবনে পদার্পণ করেন। কিছুদিন তিনি আওকাফ মন্ত্রণালয়ের ‘Board of Religious Affairs’ এ কর্মরত ছিলেন। ১৯৭৭ সালে তিনি কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘শরীয়াহ এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ অনুষদের প্রতিষ্ঠাকালীন ডীন নিযুক্ত হন। ১৯৯০ পর্যন্ত তিনি এখানে কর্মরত থাকেন এবং একই বছর তাঁর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘সীরাত ও সুন্নাহ গবেষণা কেন্দ্র’। ১৯৯০-৯১ সালে আলজেরিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের Scientific Council এর চেয়ারম্যান হিসেবে কাজ করেন। ১৯৯২ সালে কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সীরাত ও সুন্নাহ গবেষণা কেন্দ্রের ডিরেক্টর হিসেবে পুনরায় কাতার ফিরে আসেন। তিনি জর্ডানের রয়্যাল অ্যাকাডেমি ফর ইসলামিক কালচারাল অ্যান্ড রিচার্জ (Royal academy for Islamic culture and research), ইসলামি সম্মেলন সংস্থা (OIC), রাবেতা আল-আলম আল-ইসলামি এবং ইসলামিক স্টাডিজ সেন্টার, অক্সফোর্ড এর সম্মানিত সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ১৪১১ হিজরিতে ইসলামী অর্থনীতিতে অবদান রাখায় ব্যাংক ফয়সল পুরষ্কার লাভ করেন। ইসলামি শিক্ষায় অবদানের জন্য ১৪১৩ হিজরিতে মুসলিম বিশ্বের নোবেল খ্যাত কিং ফয়সাল অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন । ১৯৯৭ সালে ব্রুনাই সরকার তাকে ‘হাসান বাকলি’ পুরষ্কারে ভূষিত করে।