প্রতীচ্য বা পাশ্চাত্য দর্শনের ইতিহাসকে প্রধানত চারটি যুগ বা পর্বে বিন্যস্ত করে দেখার একটা ঐতিহ্য দার্শনিক মহলে প্রচলিত রয়েছে। যেমন: প্রাচীন যুগ, মধ্যযুগ, আধুনিক যুগ এবং সমকালীন যুগ। বর্তমান খণ্ডে শ্রীতারকচন্দ্র রায় আধুনিক যুগের একটা ধারাবাহিক ইতিবৃত্ত তুলে ধরেছেন। ১৪০০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে প্রতীচ্য দর্শনের এই আধুনিক যুগের প্রস্তুতিপর্ব শুরু হয়েছে এবং ১৮৩১ খ্রিষ্টাব্দে এ যুগের সমাপ্তি রেখা টানা হয়েছে। ফ্রান্সিসস বেকন (১৫৬১-১৬২৬) এ যুগের প্রথম দার্শনিক হিসেবে স্বীকৃত, আর জর্জ উইলহেলম ফ্রেডরিক হেগেল (১৭৭০-১৮৩১) এ যুগের সর্বশেষ দার্শনিক হিসেবে পণ্ডিত মহলে মান্যতা পেয়েছেন। শ্রীতারকচন্দ্র রায়ও তাঁর বর্তমান গ্রন্থে বেকন থেকে হেগেল পর্যন্ত দার্শনিক মনীষার রূপরেখা অনবদ্য ভাষায় তুলে ধরেছেন। আধুনিক প্রতীচ্য দর্শনের দৃষ্টিভঙ্গি মূলত বৈজ্ঞানিক। বিজ্ঞানের প্রভাবে স্নাত হয়েই এ যুগের দার্শনিকেরা দর্শনচর্চা ও মননসাধনায় আত্মনিয়োগ করেন। তাইজন্য এ যুগের দার্শনিকেরা বিশ্বভুবনকে অপার্থিব ও অলৌকিক সৌন্দর্যে বিশেষায়িত না-করে পার্থিব লোকায়ত গুণাবলির আয়নায় পর্যবেক্ষণ ও নিরীক্ষণ করেন। এ যুগের দার্শনিকদের কাছে লৌকিক বা অলৌকিক সৌন্দর্য আদৌ কোনো মান্যতা পায়নি। আধুনিক যুগের দার্শনিকদের আরাধ্য স্রেফ সত্যকে লাভ করা। সত্য যতই বা যে পরিমাণেই রহস্যঘেরা হোক-না-কেন, সেই রহস্যজাল ছিন্ন করে সত্য স্বরূপে আবিষ্কার করাই আধুনিক প্রতীচ্য দার্শনিকদের চূড়ান্ত সাধনা। বিশ্বভুবনকে কোনো লৌকিক বা অলৌকিক, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বা অতীন্দ্রিয় সৌন্দর্যের লীলাভূমি রূপে মান্যতা দেয়ার পক্ষপাতী নন তাঁরা। আধুনিক দার্শনিকদের কাছে বিশ্বভুবন প্রকৃত অর্থে এক সুবিশাল যন্ত্রস্বরূপ। তাই এ সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান অর্জন করতে হলে স্বরূপলক্ষণের জ্ঞান জানা একান্তভাবে অপেক্ষিত। এ যুগের দর্শনের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো গাণিতিক ও অবরোহ শৈলী, আন্তর্জাতিকতাবাদ এবং মুক্তবুদ্ধি ও মুক্তচিন্তা। এ আলোকেই বর্তমান যুগের দার্শনিকেরা তাঁদের দার্শনিক কর্মকাণ্ডের রূপরেখা উপন্যস্ত করেছেন। শ্রীতারকচন্দ্র রায় তাঁর বর্তমান খণ্ডে এই বৈশিষ্ট্য তিনটির আলোকেই বিষয়বস্তুকে সহজ সরল ও অনবদ্য ভাষায় উপস্থাপন করেছেন।