মনের ভেতর আরেকটি দরজা
রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন,
“আপনাকে এই জানা আমার ফুরাবে না/ এই জানারই সঙ্গে সঙ্গে তোমায় চেনা॥”
মানুষের নিজের সম্পর্কে জানার যাত্রা তেমনই- নিজেকে জানতে জানতেই স্রষ্টাকে জানা। আমরা পৃথিবীর খবর রাখি, মহাকাশের খবর রাখি, ইন্টারনেটের অসীম জগতের খবর রাখি-কিন্তু নিজের মনের খবর কতটুকু রাখি?
প্রশ্নটা সহজ। উত্তরটা সহজ নয়।
একজন মানসিক স্বাস্থ্যের সামান্য কর্মী হিসেবে আমি প্রতিদিন মানুষের গল্প শুনি। কেউ উদ্বেগে ঘুমাতে পারেন না, কেউ হতাশার অন্ধকারে ডুবে আছেন, কেউ সবকিছু পেয়েও এক অদ্ভুত শূন্যতায় ভুগছেন। অনেক সময় মনে হয়, আধুনিক মানুষ যেন সবকিছুর সঙ্গে যুক্ত থেকেও নিজের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। চারপাশে এত শব্দ, অথচ ভেতরে গভীর নীরবতা। এত যোগাযোগ, অথচ এত একাকীত্ব।
ঠিক এই জায়গাতেই খাজা ওসমান ফারুকীর “সুফি সাইকোলজি” বইটি এসে আমাদের সামনে দাঁড়ায়।
বইটি পড়তে পড়তে আমার মনে হয়েছে, এটি কোনো সাধারণ মনোবিজ্ঞানের বই নয়। আবার এটি শুধুই আধ্যাত্মিকতার বইও নয়। বরং দুই জগতের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক সেতু। এক পাশে আধুনিক মনোবিজ্ঞান, নিউরোসায়েন্স, কগনিটিভ থেরাপি; অন্য পাশে তাসাওয়ুফ, তাফাক্কুর, আত্মশুদ্ধি ও হৃদয়ের জগৎ। লেখক যেন ধীরে ধীরে আমাদের হাত ধরে এই দুই তীরের মধ্যে চলাচল করতে শেখান। সাধারণত স্পিরিচুয়ালিটি নিয়ে লেখা অনেক বই হয় কেবল ধর্মীয় উপদেশে সীমাবদ্ধ থাকে, অথবা মনোবিজ্ঞানের বইগুলো মানুষের অন্তরের অভিজ্ঞতাকে উপেক্ষা করে। “সুফি সাইকোলজি” এই দুই মেরুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে কথা বলেছে।
এই বইটির একটি বড় শক্তি হলো, এটি কঠিন বিষয়কে সহজ করে বলে। পাঠককে ভয় দেখায় না, বরং কৌতূহলী করে তোলে।
বইয়ের শুরুতেই লেখক এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করান, যা আমরা প্রতিদিন দেখছি কিন্তু খেয়াল করছি না। আমরা এখন এমন এক যুগে বাস করি, যেখানে ফোন আমাদের স্মৃতি ধরে রাখে, গুগল আমাদের জ্ঞান ধরে রাখে, আর সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের মনোযোগ ধরে রাখে। ফলে ধীরে ধীরে আমরা নিজেদের ভেতরের জগতকে হারিয়ে ফেলছি।
একটি জায়গায় লেখক উল্লেখ করেছেন, মানুষ তার শৈশবের বাসার ফোন নম্বর মনে রাখতে পারে, কিন্তু বর্তমানের সবচেয়ে কাছের মানুষের ফোন নম্বর মনে রাখতে পারে না। এই ছোট্ট উদাহরণটি যেন পুরো যুগের প্রতিচ্ছবি। এই যে মনের একটা বড় অংশ আমরা 'আউটসোর্স' করে দিয়েছি, এর ফলে আমাদের মনের ভেতরে যে আসল সম্পদ বা 'গুপ্তধন' ছিল, তা আমরা হারিয়ে ফেলেছি। লেখক একে বলছেন 'মনস্তাত্ত্বিক নিঃস্বতা' আমরা তথ্যের ভাণ্ডারে বাস করছি, কিন্তু প্রজ্ঞার অভাবে ভুগছি। আমরা সংযুক্ত, কিন্তু সংবেদনশীল নই। আমরা ব্যস্ত, কিন্তু সচেতন নই।
এই বইটি সেই হারিয়ে যাওয়া সচেতনতার খোঁজ করে।
মির্জা গালিবের একটি বিখ্যাত পঙ্ক্তি আছে-
দিল-এ নাদাঁ, তুঝে হুয়া ক্যা হ্যায়?
আখির ইস দর্দ কি দাওয়া ক্যা হ্যায়?
(ও অবুঝ হৃদয়, তোমার কী হয়েছে?
এই বেদনার শেষমেশ প্রতিকারই বা কী)
মজার ব্যাপার হলো, আধুনিক মনোবিজ্ঞান এবং সুফি মনোবিজ্ঞান-দু'টিই মূলত এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজে। মানুষ কেন কষ্ট পায়? কেন অস্থির হয়? কেন ভুল করে? কেন একই ভুল বারবার করে?
এই বইটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশগুলোর একটি হলো মানুষের ইচ্ছা ও সিদ্ধান্ত তৈরির প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা। আমরা সাধারণত মনে করি, সিদ্ধান্ত হঠাৎ করে নেওয়া হয়। অথচ লেখক দেখিয়েছেন, একটি সিদ্ধান্তেরও জন্মকথা আছে। প্রথমে আসে ক্ষণিকের চিন্তা, তারপর সেই চিন্তার সঙ্গে কথোপকথন, তারপর দ্বন্দ্ব, তারপর সংকল্প, শেষে সিদ্ধান্ত।
একজন মানসিক স্বাস্থ্য কর্মী হিসেবে আমি জানি, মানুষের জীবন অনেক সময় তার চিন্তার মানের ওপর নির্ভর করে। আমরা যা ভাবি, ধীরে ধীরে তাই বিশ্বাস করি; যা বিশ্বাস করি, তাই আচরণে প্রকাশ পায়। বইটির এই অংশটি পড়তে গিয়ে বিস্মিত হয়েছি-কারণ শত শত বছর আগে সুফি মনীষীরা মানুষের চিন্তার এই গতিপ্রকৃতি কত সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করেছিলেন!
আরও বিস্ময়কর লেগেছে ‘নফস’-এর আলোচনা।
আধুনিক মনোবিজ্ঞানে আমরা ইগো, সুপার-ইগো, অবচেতন মন ইত্যাদি নিয়ে কথা বলি। এখানে নফসে আম্মারা, নফসে লাওয়ামা এবং নফসে মুতমাইন্নাহ-এই তিনটি স্তরের আলোচনায় যেন মানুষের ব্যক্তিত্বের এক জীবন্ত মানচিত্র ফুটে উঠেছে।
নফসে আম্মারা হলো সেই অবাধ্য সত্তা, যা তাৎক্ষণিক আনন্দ চায়। নফসে লাওয়ামা হলো বিবেকের কণ্ঠ, যা ভুল করলে প্রশ্ন তোলে। আর নফসে মুতমাইন্নাহ-সেটি হলো প্রশান্ত আত্মা, যে ঝড়ের মাঝেও স্থির থাকতে পারে। বইটিতে লেখক যেন আমাদের কাঁধে হাত রেখে বলছেন-“একবার নিজের ভেতরে ফিরে তাকাও।”
আমার কাছে বইটির সবচেয়ে মূল্যবান দিক হলো, এটি শুধু সমস্যার বর্ণনা দেয় না; পথও দেখায়।
বর্তমান সময়ে “মাইন্ডফুলনেস” শব্দটি খুব জনপ্রিয়। কিন্তু লেখক দেখিয়েছেন, ইসলামী আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যে ‘হুযুরুল ক্বলব’, ‘তাফাক্কুর’, ‘তাযাক্কুর’, ‘তাদাব্বুর’-এসব ধারণা বহু শতাব্দী ধরে চর্চিত হয়ে আসছে। এগুলো কেবল ধর্মীয় পরিভাষা নয়; এগুলো মানুষের মনকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পদ্ধতি।
বিশেষ করে আধুনিক কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি (CBT)-এর সঙ্গে ইসলামী চিন্তার যে সাদৃশ্য বইটিতে তুলে ধরা হয়েছে, তা অত্যন্ত চিন্তাজাগানিয়া। লেখক দেখিয়েছেন, নেতিবাচক চিন্তা শনাক্ত করা, সেই চিন্তাকে প্রশ্ন করা, চিন্তার কাঠামো পরিবর্তন করা-এসব বিষয় আধুনিক থেরাপিতে যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি আধ্যাত্মিক আত্মপর্যালোচনার ক্ষেত্রেও। এই বইটির সবচেয়ে চমৎকার দিক হলো এটি আধুনিক মনোবিজ্ঞানের সাথে তাসাওয়াউফ বা সুফিবাদের এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটিয়েছে
বইটি পড়তে পড়তে মনে হয়েছে, লেখক আসলে আমাদের মনের এক অদৃশ্য যুদ্ধক্ষেত্রটিকে দৃশ্যমান করতে চেয়েছেন-যেখানে ভয় ও সাহস, লোভ ও বিবেক, হতাশা ও আশা প্রতিনিয়ত লড়াই করে।
সব বই তথ্য দেয় না। কিছু বই মানুষকে নিজের দিকে ফিরিয়ে দেয়।
“সুফি সাইকোলজি” আমার কাছে তেমনই একটি বই। এটি কোনো ম্যাজিক দেখায় না, কোনো অলৌকিক প্রতিশ্রুতি দেয় না। বরং ধীরে ধীরে পাঠককে নিজের ভেতরের আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। একজন চিকিৎসক হিসেবে আমি 'প্লাসিবো ইফেক্ট' বা বিশ্বাসের শক্তির কথা জানি । লেখক দেখিয়েছেন কীভাবে আমাদের বিশ্বাস আর চিন্তা আমাদের শরীরের হরমোন নিয়ন্ত্রণ এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলে । সুফি চিকিৎসাপদ্ধতিতে 'হুজুর আল-ক্বলব' বা হৃদয়ের উপস্থিতির যে কথা বলা হয়েছে, তা যেন আজকের দিনের 'মাইন্ডফুলনেস'-এর চেয়েও গভীর কোনো বিষয়। লেখক খুব সহজ করে বুঝিয়েছেন যে যখন আমাদের মন বা নফস শান্ত থাকে, তখন আমাদের রূহ বা আধ্যাত্মিক শক্তি জেগে ওঠে এবং তখন থেকেই শুরু হয় আসল আরোগ্য ।
আমরা হয়তো মানসিক স্বাস্থ্যের অনেক পদ্ধতি শিখেছি, কিন্তু আত্মার ভাষা শুনতে ভুলে গেছি। আমরা মনকে চিকিৎসা করতে শিখেছি, কিন্তু মনকে বুঝতে শিখিনি।
যারা মনোবিজ্ঞান ভালোবাসেন, যারা আধ্যাত্মিকতা নিয়ে ভাবেন, যারা জীবনের ব্যস্ততার মধ্যে হারিয়ে যাওয়া প্রশান্তিকে খুঁজছেন-তাদের জন্য এই বইটি এক অনন্য পাঠ।
আপনি যদি জানতে চান আপনার ভেতরে আরেকটি মানুষ বাস করে কি না, যদি জানতে চান কেন এত অর্জনের পরও কখনও শূন্য লাগে, যদি জানতে চান প্রশান্তি আসলে কোথায় লুকিয়ে থাকে-তাহলে এই বইটি আপনার জন্য।
হয়তো বইটি শেষ করার পর আপনি পৃথিবীকে নতুনভাবে দেখবেন না।
কিন্তু খুব সম্ভব, আপনি নিজেকে নতুনভাবে দেখতে শুরু করবেন।
আর মানুষের জীবনে এর চেয়ে বড় আবিষ্কার খুব বেশি নেই।
অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ
মে ২০২৬, ঢাকা
মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ।