প্রাণ-প্রকৃতির রঙ-রূপ-রস-সৌরভ-সুরধ্বনি গাথা মোহন পাখি সচরাচর উড়তে পারে এমন একটি প্রাণি। পালকে আবৃত দেহ, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ও প্রখর শ্রবণশক্তি সম্পন্ন উষ্ণ রক্তজাত ডিম্বজ মেরুদণ্ডী প্রাণিবিশেষ। প্রকৃতির নৈসর্গিক রূপকল্পের সমার্থক পাখি। তাই প্রকৃতি ও পাখি একে অপরের পরিপূরক; আর মানব মনে পাখি উড়ে চলার ডানা অসীম মুক্তির ঠিকানা। সৌন্দর্যের সুষমামাখা পাখি প্রকৃতির ভারসাম্যেরও রক্ষাকবজ। ভোরের নরোম আলোয় পাখির কিচির-মিচির জাগরণী আহ্বান আমাদের দিনের শুরুতেই প্রাণ এনে দেয়; মনে জাগায় শান্তি ও প্রশান্তি এবং এঁকে দেয় জীবনের চলার গতিরেখা। বৃক্ষ, নদী, পাহাড় ও আকাশ-এসব কিছুই পাখিদের আশ্রয় ও চলার পথ। তারা বীজ ছড়িয়ে বন গড়ে তোলে । ক্ষতিকর পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণ করে এবং পরিবেশ সুস্থ রাখে। প্রকৃতির মৌন নীরবতায় পাখির সুরেলা কলরব যেন জীবনের সজীব স্পন্দন। এভাবেই পাখি হয়ে ওঠে প্রাণ প্রকৃতির পরমাত্মীয়।
পাখি মানব মনের বাগানে নিত্য আসা-যাওয়া করে; সুকুমারবৃত্তির সৃজন অলিন্দের বাসিন্দা হয়ে নিয়মিত উপস্থিতি জানান দেয়। জীবনানন্দ দাশ তাঁর কবিতায় পাখি হয়ে ফিরে আসার ইচ্ছে প্রকাশ করেছেন এভাবে- “আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়ির তীরে- এই বাংলায়;
হয়তো মানুষ নয়- হয়তো বা শঙ্খচিল শালিকের বেশে...”
পাখি মুক্তির প্রতীক । পাখি শৃঙ্খল মানে না; ভাঙে । রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘পাখি' কবিতায় লিখেছেন -
“আমি মুক্ত আকাশের পাখি / বাঁধন আমার সহে না”
পাখিদের প্রতি নিখাদ ভালোবাসার অঞ্জলি ‘পাখিদের পাঠশালা'। অঞ্জলি অর্পণ করেছেন আমিনুর রশীদ কাদেরী। বৃক্ষ, ফুল ও পাখি আমাদের জীবনধারার অন্যতম অনুষঙ্গ হলেও আমরা বাহ্যিক রূপ-রসটাই অনুভব করি, কিন্তু তিনি শুধু বাহ্যিক রূপ-রসে তৃপ্ত নন, তিনি প্রকৃতির এসব সৌন্দর্যের একেবারে গভীরে প্রবেশ করে আমাদের জন্য তুলে এনেছেন হীরে-মানিক-চুনি; যার নান্দনিক বিভায় আমরা বিমোহিত। কী সেই হীরে-মানিক-চুনি? সহজ ভাষায় বলতে পারি তাঁর রচিত গ্রন্থ 'চা দেশে দেশে', 'ফুলের কথা', এবং এই ‘পাখিদের পাঠশালা’, ।
‘পাখিদের পাঠশালা' গ্রন্থ পাঠে আমরা অনুভব করতে পারি অতি নগরায়নের কারণে আজ নানাভাবে প্রকৃতি ক্ষত-বিক্ষত হওয়ায় পাখিদের আবাস ও আশ্রয়ের পরিসর ক্রমশ সঙ্কুচিত হচ্ছে। অসংখ্য প্রজাতির পাখি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এখন যারা প্রাপ্তবয়স্ক তাদের শৈশব-কৈশোর কালে যে পাখিগুলো দেখেছেন তাদের অনেকগুলোই বিলীন হয়ে গেছে। এ যেন প্রকৃতির অঙ্গহানি ঘটে যাওয়ার মতো। তাই প্রকৃতির সুস্থতা রক্ষায় এখন পর্যন্ত যে সকল পাখির প্রাণের অস্তিত্ব আছে সেগুলোর সুরক্ষায় আমাদের পরিচর্যা ও যত্নের ঘাটতি দূর করতে হবে। এই সচেতনতা সৃষ্টি না হলে পরিবেশের ভারসাম্য ক্ষুণ্ন হবে এবং প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ফলে বড় ধরনের মানবিক সংকটের অপঘাতের অশনি সংকেত দেখা দেবে। এ থেকে পরিত্রাণের জন্যে সামাজিক উদ্যোগ অপরিহার্য। ‘পাখিদের পাঠশালা' শুধু পাখিদের প্রতি মমতাই নয়, মনুষ্য জীবনকে প্রাণ-প্রাচুর্যে ভরিয়ে রাখারও আশা জাগানিয়া প্ল্যাটফর্ম। তাই ‘পাখিদের পাঠশালা' মানব সমাজের জন্যও একটি আবশ্যকীয় পাঠ।