’আছাববানু’আসলে আর দশটা উপন্যাসের মত কোনো সাধারণ ধাঁচের উপন্যাস না। এটি এক ধরনের উত্তরউপনিবেশি দার্শনিক প্রতিরোধ, যেখানে ভাষা, ধর্ম, সমাজ ও মানুষের অস্তিত্ব সবকিছু একসাথে পুনর্বিবেচিত হয়। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পন্ডিতদের তৎপরতায় বানানো পোষাকী প্রমিত বাংলার বদলে এই উপন্যাস কথা বলে সাধারণ মানুষের ভাষায়, জনমানুষের প্রতিদিনের বুলিতে। ’আছাববানু’উপন্যাসের ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম না, বরং এক ধরনের জ্ঞানতাত্ত্বিক মুক্তিও (epistemic liberation)।
আছাববানুর চরিত্রটি নিজেই এক ধরনের অস্তিত্ববাদী সফর। ছোঁয়াচে রোগে আক্রান্ত হওয়ার কারণে নিজ পরিবার তাকে ঘর থেকে বের করে দেয়, দূরে ফসলি খেতের আইলে একটা ছাপড়া বানিয়ে ওখানে রেখে আসে তাকে। স্বামী ও আত্বীয়স্বজন কর্তৃক তাকে বর্জনের বিষয় এবং এর পরের নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে সে এক নতুন আত্ম-উপলব্ধি খুঁজে পায়। গুটি বসন্তে আক্রান্ত আছাববানুকে ঘর থেকে বের করে দেয়া কেবল ঘর থেকে বের করে দেয়া না, বরং‘অপর’বানিয়ে দেয়ার (othering) একটি সামাজিক প্রক্রিয়া। এ অবস্থায় সে দূরে কোথাও গিয়ে শান্তিতে মরার জন্য অন্ধকার রাতে অজানার পথে বের হয়ে যায়। কিন্তু মরে না, বেঁচে থাকে। দূরবর্তী অঞ্চলের আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব মোস্তারা বেগমের সহযোগিতায় শিকড়-ডালপালা মেলে প্রবলভাবে বেঁচে থাকে। সে পরিণত হয় স্বাধীন মানুষে। ধর্মের মধ্যে থেকেও ধর্মের সামাজিক তাফসির অমান্য করে, রোজা থেকেও বিড়ি খায়। সমাজের ক্ষমতাকাঠামোর সাথে সংঘাতে জড়ায়, পুরুষমানুষের সাথে মিলে হাওড়ে কাজ করে। আবার দিনশেষে নিজের মুখোমুখি বসে আল্লাহকে চিনার চেষ্টা করে। কোন কোন দিন জিকিরে মশুগুল হয়, কোন কোন দিন দিল-ফানা করা মুর্শিদী গানে। ’আছাববানু’উপন্যাস বাংলাসাহিত্যে এক আত্মসচেতন, বিপ্লবী, দুর্দান্ত নারী চরিত্রের আত্ম প্রকাশ।
ফয়েজ আলমের চিন্তার ধরন, রোখ ও জায়গা আমাদের প্রচলিত ধারার সাহিত্যভাবনা ও বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তা থেকে ভিন্ন। একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক, অনুবাদক, উত্তর-উপনিবেশী তাত্ত্বিকা উপনিবেশী শাসন-শোষণ আর তার পরিণাম, রাষ্ট্র ও সমধর্মী মেল কর্তৃক ব্যক্তির উপর শোষণ-নিপীড়ন ও ক্ষমতার নানামুখী প্রকাশ আর এসবের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে টিকে থাকার কৌশল নিয়ে দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে লিখছেন তিনি। বিশ্বায়নের নামে পশ্চিমের নয়াউপনিবেশী আর্থ-সাংস্কৃতিক আগ্রাসন আর রাষ্ট্র ও স্বার্থকেন্দ্রিক গোষ্ঠীর শোষণচক্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তাঁর লেখা আমাদের উদ্দীপ্ত আর সাহসী করে তোলে। ফয়েজ আলমের জন্ম ১৯৬৮ সালে, নেত্রকোনা জেলার আটপাড়ার যোগীরনগুয়া গ্রামে। বাবা শেখ আবদুস সামাদ, মা সামসুন্নাহার খানম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে বিএ (সম্মান) ও এমএ পাস করার পর প্রাচীন বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতিবিষয়ক গবেষণার জন্য এমফিল, ডিগ্রি লাভ করেন ফয়েজ আলম। গুরুত্বপূর্ণ কাজ: ব্যক্তির মৃত্যু ও খাপ-খাওয়া মানুষ (কবিতা, ১৯৯৯); প্রাচীন বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতি (গবেষণা, ২০০৪); এডওয়ার্ড সাঈদের অরিয়েন্টালিজম (অনুবাদ, ২০০৫); উত্তর-উপনিবেশী মন (প্রবন্ধ, ২০০৬); কাভারিং ইসলাম (অনুবাদ, ২০০৬), ভাষা, ক্ষমতা ও আমাদের লড়াই প্রসঙ্গে (প্রবন্ধ, ২০০৮); বুদ্ধিজীবী, তার দায় ও বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্ব (প্রবন্ধ, ২০১২), জলছাপে লেখা (কবিতা, ২০২১); ভাষার উপনিবেশ: বাংলা ভাষার রূপান্তরের ইতিহাস (প্রবন্ধ, ২০২২), রাইতের আগে একটা গান (কবিতা, ২০২২)।