প্রফেসর ড. সাইয়েদ হোসাইন নাসর। প্রখ্যাত আলেম, দার্শনিক ও মুতাফাক্কির। সমকালীন ইসলামী দর্শন, তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব ও বিজ্ঞান দর্শনের ক্ষেত্রে তাকে অন্যতম অথরিটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ইসলামী দর্শন, তাসাউফ, মেটাফিজিক্স, ইসলামে বিজ্ঞান দর্শন, পরিবেশ-চিন্তা, শিল্পকলা এবং আধুনিকতার সমালোচনামূলক বিশ্লেষণসহ নানাবিধ বিষয়ে প্রগাঢ় অধিকারের জন্য তিনি সুপরিচিত। আধুনিক কালে ইসলামী জ্ঞানতাত্ত্বিক ঐতিহ্যকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং পশ্চিমা আধুনিকতার প্রেক্ষাপটে ইসলামী সভ্যতার ঐতিহ্যসমৃদ্ধ জ্ঞানব্যবস্থার গুরুত্ব তুলে ধরার ক্ষেত্রে তার অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সাইয়েদ হোসাইন নাসর ১৯৩৩ সালে তেহরানে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ছিলেন একজন চিকিৎসক ও শিক্ষাবিদ, যার কাছেই তার প্রাথমিক পড়াশোনার হাতেখড়ি। পররবর্তীতে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যান এবং Massachusetts Institute of Technology-এ পদার্থবিজ্ঞান অধ্যয়ন করেন। পরবর্তীতে তিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞানের ইতিহাস ও দর্শনে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। পশ্চিমা দর্শন এবং ইসলামী দার্শনিক ঐতিহ্যের উপর তার প্রগাঢ় অধিকার তার বিশিষ্ট চিন্তাভাবনাকে বহুমাত্রিকভাবে হাজির করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
একজন বহুপ্রজ দার্শনিক ও বহুভাষী চিন্তাবিদ হিসেবে নানান বিষয়ে নাসর লিখেছেন। দর্শন থেকে সাহিত্য, তাসাউফ থেকে বিজ্ঞান, শিল্প থেকে ইতিহাস নানান বিষয়ে তিনি অনবরত লিখেছেন। তার রচিত গ্রন্থের সংখ্যা ৫০ এর অধিক, এবং গবেষণা প্রবন্ধের সংখ্যা ৫ শত এর অধিক। বর্তমানে সাইয়েদ হোসাইন নাসর যুক্তরাষ্ট্রের জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটিতে-এ ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগে অধ্যাপনা করছেন। তিনি এখনো সক্রিয়ভাবে লেখালেখি, বক্তৃতা ও বিভিন্ন আলোচনায় অংশগ্রহণ করছেন এবং বিশ্বব্যাপী ইসলামী চিন্তা ও সভ্যতার ধারণাকে তুলে ধরার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছেন।
প্রায় শতবর্ষী এ বহুপ্রজ দার্শনিকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি গ্রন্থ হলো 'Man and Nature: The Spiritual Crisis in Modern Man'। সত্তরের দশকে নাসরের এ গ্রন্থটি এক অর্থে বস্তুবাদী পশ্চিমা সভ্যতার বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি ও বিজ্ঞান দর্শনের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিলো। গুরুত্বপূর্ণ এ গ্রন্থটি এককথায় মেটাফিজিক্স এবং পাশ্চাত্যের তৈরিকৃত বস্তুবাদী জগতে মেটাফিজিক্সের প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন কীভাবে সম্ভব তার উপর লিখিত। নাসর দেখিয়েছেন, মেটাফিজিক্স ও আখলাক থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে পাশ্চাত্য যে কথিত আধুনিকতা তৈরি করেছে, তার বাইপ্রোডাক্ট হলো ‘আধুনিক মানুষ’ যারা কিনা জীবনের সকল ক্ষেত্রে ভয়াবহ আধ্যাত্মিক শূন্যতা ও প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যহীনতার সংকটে বিপর্যস্ত ও জর্জরিত।
নাসর বলতে চেয়েছেন, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা থেকে উদ্ভূত নাস্তিকতা, অজ্ঞেয়বাদ কিংবা অধুনা মানুষের ভয়াবহ আধ্যাত্মিক শূন্যতা স্রেফ প্রযুক্তি কিংবা যান্ত্রিক জীবনযাপনের ফলাফল নয়। বরং, পাশ্চাত্য মহাবিশ্বকে দেখার যে দৃষ্টিভঙ্গি এবং দার্শনিক চোখ তৈরি করেছে, এগুলো তারই ফলাফল মাত্র। ফলত, নাসর এককথায় আজকের দুনিয়ার সংকটের একধরনের ময়নাতদন্তের ভেতর দিয়ে গেছেন, যেখানে তিনি কেবল সংকট নিয়ে আলোচনা করেই ক্ষান্ত থাকেননি, বরং সংকট উদ্ভূত হওয়ার কারণগুলো নিয়ে আলোচনা করেছেন।
অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ গ্রন্থটি বাংলা ভাষায় অনুবাদ করেছেন তরুণ অনুবাদক ও চিন্তক মুশফিকুর রহমান। ইতিপূর্বে তার অনূদিত প্রফেসর ড. ইউসুফ আল কারযাভীর গ্রন্থ ‘মুমিন জীবনে ঈমানের প্রভাব’ পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে। এছাড়া রোয়াক ব্লগেও তিনি বেশকিছু প্রবন্ধ অনুবাদ করেছেন। দ্বিতীয় অনুবাদ হলেও, অত্যন্ত জটিল এ গ্রন্থটির আলোচনা অত্যন্ত সাবলীলভাবে তুলে ধরেছেন তিনি।
উত্তর আধুনিক সময়ে এসে পাশ্চাত্যের প্রস্তাবিত সমাধানসমূহ যখন প্রমাণিত হয়েছে অযৌক্তিক ভ্রমে, পাশ্চাত্যের বিশ্বব্যবস্থা যখন মানুষকে তার ন্যূনতম অধিকারের পরিবর্তে কায়েম করেছে নব্য আধিপত্য ও শোষণমূলক ব্যবস্থা, মানুষের ভেতরকে অন্তসারশূন্য করে তাকেও নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছে যন্ত্রের মতো- তখন এই গ্রন্থটির প্রয়োজনীয়তা ও প্রাসঙ্গিকতা অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। নাসরের ক্ষুরধার আলোচনা ও দার্শনিক উপলব্ধি এবং অনুবাদকের পরিশ্রমের মিশেল গ্রন্থটির বঙ্গানুবাদকে সুখপাঠ্য করেছে।