মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা অত্যন্ত সুন্দর করে সৃষ্টি করেছেন এই বিশ্ব ও মহাবিশ্বকে। এরপর তিনি এর চাইতেও সর্বোৎকৃষ্ট ও সুন্দরতম আকৃতি ও অবয়ব দিয়ে সৃজন করেছেন মানবজাতিকে। মানবজাতিকে তিনি শুধু দেহ আর আকৃতিতেই সুন্দর করেন নি, তাদেরকে দিয়েছেন একটি সুন্দর হৃদয় ও বিবেক। অতঃপর চারটি বস্তুর শপথ নিয়ে তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, “নিশ্চয়ই আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি সর্বোত্তমভাবে।” (সূরা ত্বীন, আয়াত ৪)
মহান আল্লাহ তাঁর এই সর্বোৎকৃষ্ট ও সবচেয়ে আদরের সৃষ্টি মানুষকে বিশেষ কিছু কাজ দিয়ে খুবই সংক্ষিপ্ত সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ সফরে প্রেরণ করেছেন এই দুনিয়াতে। যেন মহান আল্লাহ দেখে বাস্তবে প্রত্যক্ষ করে নিতে পারেন যে মানুষ তার জীবনকে কিভাবে পরিচালিত করলো। কে সৎকর্ম করলো, আর কে মন্দ ও গুনাহের মাঝে লিপ্ত হলো।
দুনিয়ার এই স্বল্পকালীন সময়ে মানুষের সকল ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায়, সাফল্য-ব্যর্থতা সবকিছুই নোট করা হচ্ছে। হচ্ছে রেকর্ড। এর সব হিসাবই সংরক্ষিত করছেন মহান আল্লাহর নিযুক্ত সম্মানিত ফিরিশতাগণ। যা কিয়ামতের সেই কঠিন দিন আমাদের সবার সামনে উন্মুক্ত করে দেয়া হবে। অতঃপর প্রত্যেককেই তার নিজ নিজ আমলনামা ও হিসাব-নিকাশ পড়তে বলা হবে। সেদিন অনেকে যেমন আনন্দিত হবে, তেমনি অনেকে ভীষণ দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে আত্মগোপন করতে চাইবে। কিন্তু সেদিন শত আফসোস আর হাহাকার করেও কোনো লাভ হবে না। কারণ বলা হবে যে তোমার একাউন্ট ও হিসাব তো অফ হয়ে গেছে। যোগ-বিয়োগ ও আয় ব্যয় যা হওয়ার হয়ে গেছে। এখন আর নতুন করে কিছু সংযোজন বা বিয়োজনের আর কোনো সুযোগ নেই। দুনিয়াতে ভালো বা মন্দ যা করেছে এখন তার প্রতিফল তথা পুরস্কার বা তিরস্কার গ্রহণ করার সময়।
পরকালের সেদিনের জন্য যদি সতর্ক হতে হয় তাহলে আমাদের তা হতে হবে এখনই। যদি সেদিনের জন্য কোনো প্রস্তুতি নিতে হয় তাহলে তা নিতে হবে এখনই। কারণ আমাদের নিঃশ্বাস বন্ধ হওয়ার সাথে সাথে বরং তারও আগে মৃত্যু যন্ত্রণা শুরু হওয়ার পূর্বক্ষণ থেকেই সকল মানুষের হিসাব নিকাশের খাতার সব কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া হয়। মৃত্যুর সামনে উপস্থিত হয়ে, মৃত্যু যন্ত্রণা চলে আসার পর তওবা করলেও কোনো লাভ নেই। তওবা করতে হবে সুস্থ ও স্বাভাবিক থাকা অবস্থাতেই। ভালো কিছু করতে চাইলে তাও করতে হবে মস্তিষ্ক সক্রিয় থাকা ও বিবেক স্বাভাবিক থাকা অবস্থাতেই। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতা ও প্রচলিত সামাজিক কুসংস্কার হতে আমরা আমাদের জীবন ও পরকাল সম্পর্কে একটি দর্শন পোষণ করে থাকি আর তা হচ্ছে- সারা জীবন অন্যায়-অপরাধ যা করার তা করে রিটায়ার করার পর, ৬০-৬৫ বছর বয়সের সময় একবার হজ্জ্ব করে মৃত্যুর আগে একেবারে হাজী হয়ে ভালো হয়ে যাবো। -এ ধরণের ধারণা সম্পূর্ণ ভুল ও চূড়ান্ত পর্যায়ের বোকামী। অথচ কতো মানুষই যে আমাদের সামনে অল্প বয়সে বা মধ্য বয়সে হঠাৎ করে চলে গেলো তা দেখেও আমাদের শিক্ষা হয় না। আমাদের ভুল ধারণার পরিবর্তন আসে না।
বক্ষমান বইটিতে মহান আল্লাহর সৃষ্টি হিসেবে আমাদের দায়িত্ব-কর্তব্য, আল্লাহর আনুগত্য, আখেরাতের প্রস্তুতি, ইসলামী সমাজ, সভ্যতা, আধুনিকতা নামক মরীচিকা ইত্যাদিসহ নানাবিধ বিষয় তুলে ধরেছেন শ্রদ্ধেয় লেখক জনাব মো: আব্দুল বারী (এফসিএ) দা. বা.। তিনি তার জীবনের দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন এমন স্থানে যেখানে যাওয়ার জন্য আজকের যুব-তরুণ ও শিক্ষিত সমাজ একেবারেই অধীর, অস্থির। আমাদের সামনে ইউরোপ-আমেরিকা ও পাশ্চাত্যের জাঁকজমক ও বাহ্যিক জৌলুস অত্যন্ত আকর্ষণীয় অথচ পাশ্চাত্যের সেই মরিচিকার পেছনের আসল অন্ধকার এবং ভয়ংকর পরিণতি সম্পর্কে আমরা উদাসীন। ইসলাম ও কুফরের বিষয়টি সম্পর্কে সম্যক অবগতি ও বাস্তবতা অনুধাবনের মতো মানুষ বর্তমানে খুবই কম। আর এটা উপলব্ধি করার পর তা অন্যদেরকে জানানোর মতো উদ্যোগী হওয়ার সংখ্যা তো একেবারেই নগণ্য।
এই বইয়ের কাজ করা অবস্থায় আমার যে ধারণা বদ্ধমূল হয়েছে তা হলো, সম্মানিত লেখক অন্যান্য লেখকদের মতো লেখার জগতে প্রাচীন ও খুব অভিজ্ঞ না হলেও তিনি অন্তর দৃষ্টি দিয়ে ইসলাম ও কুফরের আসল
বাস্তবতা অনুধাবন করতে পেরেছেন যথোপযুক্তভাবে, যার ধারে কাছেও আমরা অনেকেই এখনও যেতে পারি নি।
যার আবশ্যিক ফলশ্রুতিতে পাঠকগণ এই বইতে একজন ব্যথিত ও দরদী অভিভাবকের হৃদয়ের আকুতি শুনতে পাবেন। এ বইয়ের পাতায় পাতায় নিজেদের জীবন ও সমাজে কাজে লাগাবার মতো অনেক উপকরণ ও পাথেয় পেয়ে যাবেন এতোটুকু বেশ আস্থার সাথেই বলতে পারি।