Product Specification & Summary

“দাঙ্গার ইতিহাস” প্রথম ফ্ল্যাপের কথা:
দাঙ্গা শব্দটি কানে যাওয়া মাত্র সর্বাঙ্গ দিয়ে হিম-শিহরণ বয়ে যায়। কারণ এর সঙ্গে অপরিহার্যভাবে জড়িয়ে আছে। যেসব জিনিস তা হল হত্যা, লুণ্ঠন, ধর্ষণ, অসহায়ের বুকফাটা হাহাকার, অগ্নিসংযোগ ও সেই সঙ্গে কোটি কোটি টাকার সম্পত্তির বিনষ্টি। এক কথায় দাঙ্গা মানুষকে উন্মত্ত রক্তলোলুপ হিংস্ৰ জীবে পরিণত করে। এই
সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার শুরু বহু বছর আগে এবং চলছে আজও। হিন্দু-মুসলমান, হিন্দুশিখ, শিয়া-সুন্নি, মুসলমান-বৌদ্ধ, হিন্দুবৌদ্ধ-জৈন-খ্রীস্টান প্রমুখ ধর্মের নামে দাঙ্গা ছাড়াও সমাজের অগ্রসর-অনগ্রসর আদিবাসীর দাঙ্গা ও ভাষার নামেও যেমন— মারাঠী-গুজরাতী-কন্নড়-অসমীয়া-বাংলা, ওড়িয়া হিন্দী-উর্দু নিয়েও দাঙ্গা সঙ্ঘটিত হয়ে চলেছে আজও ভারতে। এই সব দাঙ্গার কারণ ও পরিণতির কথা বিশদভাবে এই গ্রন্থে আলোচিত হয়েছে। বাংলা তথা ভারতীয় ভাষায় এই রকম একখানি গবেষণামূলক পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ এযাবৎ প্রকাশিত হয়নি।

ভূমিকা:
শ্ৰীশৈলেশকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় সৎ ও কুশলী লেখক। কুশলী লেখক আরো আছেন, কিন্তু শৈলেশকুমারের মতো সৎ লেখক বেশি নেই। ‘বাঙ্গালার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদনে” বঙ্কিমচন্দ্র লিখেছিলেন, “যদি মনে এমন বুঝিতে পারেন যে, লিখিয়া দেশের বা মনুষ্যজাতির কিছু মঙ্গল সাধন করিতে পারেন, অথবা সৌন্দর্য সৃষ্টি করিতে পারেন,তবে অবশ্য লিখিবেন।” বঙ্কিমচন্দ্র আরো বলেছিলেন, “পরনিন্দা বা পরপীড়ন বা স্বার্থসাধন যাহার উদ্দেশ্য, সে সকল প্ৰবন্ধ কখনও হিতকর হইতে পারে না।” শৈলেশবাবু দেশের মঙ্গল সাধনের জন্যই লেখেন। পরনিন্দা বা পরপীড়ন বা স্বার্থসাধন। তাঁর উদ্দেশ্য নয়। আমার ধারণা তাঁর লেখায় মঙ্গল সাধিত হয়। তিনি যখন অপ্রিয় সত্য লেখেন। তখনও কাউকে পীড়া দেবার জন্য লেখেন না, দেশের মঙ্গলচিন্তা থেকেই লেখেন। আশা করি, দাঙ্গার ইতিহাস পড়তে গিয়ে পাঠক একথা মনে রাখবেন, লেখকের সঙ্গে পাঠকের মতের পার্থক্য থাকলেও উদ্দেশ্যের সততা সম্বন্ধে নিঃসন্দেহ থাকবেন।
ভারতে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ বিশেষত হিন্দু মুসলমানের ভিতর দাঙ্গা নিয়ে শৈলেশবাবুর দাঙ্গার ইতিহাস। এই মুহুর্তে বিষয়টির গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে বলার অপেক্ষা রাখে না। দেশ স্বাধীন হবার আগে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার জন্য আমরা, বিশেষত হিন্দু উচ্চবর্ণের মানুষেরা, বিদেশী শাসকের ভেদনীতিকে দায়ী করেছি। তার সপক্ষে কিছু প্রমাণও ছিল। কিন্তু আজকের পরিস্থিতিতে সেইসব কথায় কাজ হবার নয়। শৈলেশবাবু যথার্থই লিখেছেন, “পাকিস্তান সৃষ্টির জন্য সাম্রাজ্যবাদী শাসকদের ভেদনীতি বৃপী বলির পাঠা। আমরা যদি খুঁজে পেয়েও থাকি, তবু স্বাধীনতা-উত্তর ভারতে আসাম, পাঞ্জাব ও কাশ্মীরে যে বিচ্ছিন্নতাবাদ মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে দেখছি তার জন্য ঐ ভেদনীতিকে সরাসরি দায়ী করার উপায় নেই।” এর পরও অবশ্য দায়িত্ব নিজের ঘাড়ে না নেবার পথ আছে, পাঞ্জাব ও কাশ্মীরের জন্য পাকিস্তানকে দোষ দেওয়া যায়, আসামের জন্য বাংলাদেশকে অথবা অন্য কোনো দেশকে। শৈলেশবাবু ঐরকম কোনো যুক্তি মানবেন না। তিনি লিখেছেন, “যে শিখ সম্প্রদায় জিন্নার দেওয়া অনেক প্রলোভনকে উপেক্ষা এবং প্রভূত রক্ত ও অশুর বিনিময়ে পাকিস্তানের আমন্ত্রণকে অগ্রাহ্য করে ভারতের অঙ্গ হয়েছিল. তাঁরা এমনভাবে হঠাৎ “পাকিস্তানের প্ররোচনায়” পড়বেন কেন—এই প্রশ্নের জবাব অন্যান্য ভারতবাসীদের দিতেই হবে।” এইসব তর্কের শেষ নেই। আসল কথা, শুধু দোষারোপে আর পরনিন্দায় লাভ নেই। সমস্যার সমাধানটাই জরুরী। শুধু দোষারোপে সমস্যার সমাধান হবে না। কাজেই অন্যভাবে ভাবতে হবে । সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বারবার ঘটে চলেছে। প্রত্যেকটি বড় দাঙ্গার পর বাইরে থেকে, বিশেষত বাংলাদেশ থেকে, উদবাস্তুরা ভারতে বিশেষত পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করছে। দাঙ্গার বাইরে অন্য সময়েও নানা কারণে এইরকম অনুপ্রবেশ চলছে। ভারতের ও পশ্চিমবঙ্গের সমাজ ও অর্থনীতির পক্ষে এই ধাক্কা সামলানো সহজ নয়। আমাদের চেয়ে আর্থিকভাবে অনেক সবল জার্মানিও উদবাস্তুর ধাক্কা সামলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। ভারত সরকার যদি উদবাস্তুদের জন্য দ্বার বন্ধ করবার নীতি গ্ৰহণ করেন। তবে সেটা দুঃখজনক হলেও খুব দোষণীয় বলা যাবে না। তবে এর ভিতর একটা গণ্ডগোল আছে। হিন্দু উদবাস্তুদের জন্য দ্বার বন্ধ করতে এদেশের অনেকেই রাজি হবেন না। রাজনীতিক বা ধর্মগত কারণে র্যারা উৎপীড়িত তাদের আশ্রয় দেবার একটা ঐতিহ্য অনেক দেশ মেনে নিয়েছে। ইসলামী রাষ্ট্র ছেড়ে হিন্দু উদবাস্তু এদেশে আশ্রয় চাইলে তাঁদের ব্যাপারটা হিন্দুপ্রধান ভারত বিশেষ দৃষ্টিতে দেখতে চাইবে । ভারত সরকার সেটা মেনে নিতে পারেন।
এদেশে মুসলমানের সংখ্যা আজ দশ কোটির ধারে কাছে। ভারতের বাইরে প্রতিবেশী বাংলাদেশে বা পাকিস্তানে এতো হিন্দু নেই। চরমপন্থী কিছু, হিন্দু উত্তেজনার মুহুর্তে জনবিনিময়ের কথা বলেন। এটা অবাস্তব কথা। পাকিস্তান বা বাংলাদেশের সরকার ভারতীয় মুসলমানদের আশ্রয় দিতে রাজি হবেন না। এ ব্যাপারে জোর করে কোনো সুফল হবে না। জোরজুলুমে দাঙ্গা বাড়বে। তাতে হাজার হাজার মানুষের প্রাণ যেতে পারে, কিন্তু কোটি কোটি মানুষের এই বিরাট দেশে কয়েক লক্ষ লোক উৎখাত হলে বা মারা গেলেও তাতে জনসংখ্যার বিশেষ তারতম্য হবে না। মাঝখান থেকে শুধু গুণ্ডাদের শক্তি বাড়বে, বিশৃঙ্খলা বাড়বে, সাধারণ কেনা বেচা ও উৎপাদনের কাজে বাধা পড়বে। দেশের ভিতর সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ বাড়বে। প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে তিক্ততা বাড়বে। ঘটনার স্রোত আমাদের রক্তাক্ত যুদ্ধের দিকেও ঠেলে দিতে পারে। আমাদের দুর্বল অর্থনীতির উপর যুদ্ধের আঘাতে কারো কোনো মঙ্গল হবে না।
যুদ্ধ করে ভারত তার অভীষ্ট সিদ্ধ করতে পারবে না। পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের যুদ্ধে ইসলামী জগতের সহানুভূতি ভারতের দিকে থাকবার কথা নয়। পশ্চিম এশিয়ার ওপর শুধু তেলের জন্য নয়, আরো নানাভাবে আমরা নির্ভরশীল। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে আরো নানা দুর্ঘটনার আশংকা বাড়বে। আণবিক বোমা পাকিস্তানের নাগালের খুব বাইরে নয়। মুসলিম শক্তির সঙ্গে যুদ্ধের ফলে মার্কিন দেশের ওপর আমাদের নির্ভরতা আরো বাড়বে। এতে কোনো সমস্যার সমাধান হবে না। যুদ্ধ আজ সমস্যার সমাধানের পথ নয়, শান্তিই পথ। ভারত পাকিস্তান বাংলাদেশ সকলের পক্ষেই শান্তিই পথ। ভারতে হিন্দু ও মুসলমান কীভাবে একত্রে শাস্তিতে বাস করতে পারে, ভারত ও প্রতিবেশী মুসলিমসহ অন্যান্য রাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তি ও সহযোগিতা কীভাবে বাড়ানো যায়, এটাই আজ শুভবুদ্ধিসম্পন্ন সব মানুষের পক্ষে চিন্তার বিষয়। বিশ্বের রাজনীতিতে নেহরুর যুগ থেকে আমরা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের কথা বলে এসেছি। সেই সহাবস্থানের পরীক্ষা আমাদেরও দিতে হবে।
১৯৪৭ সালে এই উপমহাদেশ বিভক্ত হয়েছিল। আবারও একদিন দেশ ঐক্যবদ্ধ হবে, এ আশা আমাদের রাখতে হবে। কিন্তু সেই ঐক্যের লক্ষ্যে আমরা পৌঁছতে পারব না। দাঙ্গা আর যুদ্ধের পথ ধরে। শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের জন্য নতুন নীতি চাই দেশের ভিতরে এবং বাইরে। পাকিস্তানের ভিতরও অন্তর্বিরোধ আছে। এই প্রসঙ্গে খান আবদুল গফফর খানের কথা মনে পড়ে। দেশবিভাগ তিনি চান নি। পাকিস্তান গঠিত হবার পর তাঁর আপন জন অসহায় পাখতুনদের সেবাতেই তিনি নিযুক্ত থাকতে চান, তাই পাকিস্তানেই থেকে যান। সেই সময় তিনি বলেছিলেন, পাঞ্জাবি-পাখতুন-বালুচ-সিন্ধি-ও-বাঙালিদের (পূর্ববঙ্গ তখনও পাকিস্তানের অঙ্গ ছিল) নিজ নিজ রাজ্যে স্বায়ত্তশাসনের স্বীকৃতির ভিত্তিতে পাকিস্তানে একটি বিকেন্দ্ৰিত যুক্তরাষ্ট্র স্থাপিত হওয়া উচিত। এইরকম একটি ধারণা সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশের পক্ষেই সাধু ও প্রযোজ্য। এক অখণ্ড বিকেন্দ্ৰিত যুক্তরাষ্ট্র এই উপমহাদেশে স্থাপন করবার কথা চিন্তা করবার মতো সাহস নিয়ে নতুন প্রজন্মের তরুণেরা কি এগিয়ে যেতে পারবেন ?
এমন চিন্তা এই মুহুর্তে অবাস্তব ও কাল্পনিক মনে হতে পারে। কিন্তু আমাদের জীবনেই এমন ঘটনা বারবার ঘটে গেছে যাকে দুদিন আগেও অসম্ভব মনে হয়েছে। এই উপমহাদেশে সৈন্যবাহিনীকে বহুমূল্য ও ভয়ংকর অস্ত্রে সজ্জিত করে সামূহিক বিনষ্টির অভিমুখে অন্ধের মতো এগিয়ে যাবে, এটাই কি একমাত্র বাস্তব কথা ? যুদ্ধ নয়, দাঙ্গা নয়, মৈত্রীপূর্ণ সহাবস্থান ও গঠনমূলক সম্মিলিত কর্মচেষ্টা চাই। তার আগে দেশের বুদ্ধি ও বাধির পরিবর্তন আবশ্যক ।
যে ধর্ম মানুষকে বিভক্ত করে রবীন্দ্রনাথ তাকে বলেছেন ‘ধর্মমোহ । যে ধর্ম বৃহত্তর মিলনের ভিতর দিয়ে মুক্তির পথে নিয়ে যায়, সেই ধৰ্মই শ্রদ্ধেয়। "ধর্মকারার প্রাচীরে বীজ হানো”— এই ছিল রবীন্দ্রনাথের আহবান। দাঙ্গার ইতিহাস থেকে র্যারা শুধু দাঙ্গা বাধাবার মন্ত্র গ্রহণ করেন তাঁরা দেশকে বিপথে নিয়ে যাচ্ছেন। স্মরণ করবার মতো অন্য ঐতিহ্য এই দেশেই আছে। সাম্রাজ্যবাদী নিপীড়নের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সীমান্ত গান্ধী শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেছিলেন যে, বুদ্ধের ছিল অন্য এক হৃদয়জোড়া সাম্রাজ্য যার বাণী একদিন সীমান্তে গিয়েও পৌঁছেছিল। দেশের হৃদয়ে যদি শান্তির বাণী আবারও স্থান পায়। তবেই সব দিক থেকেই মঙ্গল। দাঙ্গার ইতিহাস থেকে আমাদের গ্ৰহণ করতে হবে শান্তি আন্দোলনের প্রেরণা।

Title দাঙ্গার ইতিহাস
Author
Publisher
ISBN 8172930852
Edition 4th Edition, 2015
Number of Pages 448
Country ভারত
Language বাংলা

Customers who bought this product also bought

Reviews and Ratings

5.0

8 Ratings

call center

Help: 16297 / 01519521971 24 Hours a Day, 7 Days a Week

Pay cash on delivery

Pay cash on delivery Pay cash at your doorstep

All over Bangladesh

Service All over Bangladesh

Happy Return

Happy Return All over Bangladesh