ইমাম শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী রহ. উপমহাদেশের ইসলামী জাগরণ, চিন্তা ও সংস্কার আন্দোলনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পুরুষ। অষ্টাদশ শতাব্দীর ভারতীয় উপমহাদেশে ধর্মীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক অবক্ষয়, আকীদাগত বিভ্রান্তি এবং মুসলিম সমাজের সামগ্রিক সংকটের প্রেক্ষাপটে তিনি কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক এক সুসমন্বিত সংস্কারধর্মী চিন্তাধারার ভিত্তি স্থাপন করেন। তাঁর দাওয়াত, গবেষণা ও কর্মধারা মুসলিম সমাজকে আত্মপরিচয়, ঐক্য এবং পুনর্জাগরণের নতুন দিগন্তের সন্ধান দেয়।
তিনি কুরআন, হাদীস, ফিকহ, তাফসীর, তাসাওউফ, হিকমাহ, শরীয়ত, দর্শন ও ইসলামী জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় অসামান্য অবদান রেখে গেছেন। তাঁর চিন্তা ও কর্মধারা আজও ইসলামী জাগরণ, তাজদীদী আন্দোলন এবং উম্মাহর বুদ্ধিবৃত্তিক পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে এক অনন্য প্রেরণার উৎস।
‘ইমাম শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী রহ. : স্মারকগ্রন্থ’ তাঁর জীবন, কর্ম, চিন্তা, অবদান ও উত্তরাধিকারের একটি তাৎপর্যপূর্ণ উপস্থাপনা।
মূলত আজ থেকে প্রায় একশ' বছর পূর্বে উপমহাদেশের প্রখ্যাত চিন্তাবিদ আলেম হযরত মাওলানা মুহাম্মাদ মনযূর নোমানী রহ. তাঁর সম্পাদিত প্রসিদ্ধ উর্দু মাসিক 'আল-ফুরকান'-এ ‘শাহ ওয়ালিউল্লাহ বিশেষ সংখ্যা’ শিরোনামে এ মূল্যবান সংকলনটি প্রকাশ করেন। বর্তমান স্মারকগ্রন্থটি সেই ঐতিহাসিক বিশেষ সংখ্যার বাংলা অনুবাদ, যার সঙ্গে কিছু সংযোজন রয়েছে।
এই গ্রন্থের মাধ্যমে পাঠক ইমাম শাহ ওয়ালিউল্লাহ রহ.-এর বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব, গভীর জ্ঞান, সুদূরপ্রসারী চিন্তা এবং মুসলিম সমাজ সংস্কারে তাঁর ঐতিহাসিক ভূমিকা সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট ও সমন্বিত ধারণা লাভ করবেন।
বিশেষত বর্তমান সময়ের মতভেদ, বিভ্রান্তি ও বুদ্ধিবৃত্তিক চ্যালেঞ্জের প্রেক্ষাপটে শাহ ওয়ালিউল্লাহ রহ.-এর চিন্তাধারা আমাদের জন্য একটি ভারসাম্যপূর্ণ, ঐক্যনির্ভর ও সুদূরপ্রসারী দিকনির্দেশনা প্রদান করে। আধুনিক বুদ্ধিবৃত্তিক সংকট মোকাবিলায় এ স্মারকগ্রন্থটি একটি গুরুত্বপূর্ণ 'বুদ্ধিবৃত্তিক মাইলফলক এবং একটি সমন্বিত ও শক্তিশালী 'ইন্টেলেকচুয়াল ফ্রেমওয়ার্ক' হিসেবে পাঠকের সামনে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে
মুহাম্মদ মনজুর নোমানী (১৫ ডিসেম্বর ১৯০৫ – মে ১৯৯৭) ছিলেন একজন ভারতীয় দেওবন্দি ইসলামি পণ্ডিত। তার লিখিত রচনাগুলির মধ্যে প্রসিদ্ধ হলো, মাআরেফুল হাদিস, ইসলাম কেয়া হায়। তিনি ১৯২৭ সালে দারুল উলুম দেওবন্দ থেকে স্নাতক হন। সেখানে তিনি আনোয়ার শাহ কাশ্মীরির অধীনে হাদীস অধ্যয়ন করেন। তিনি চার বছর দারুল উলূম নদওয়াতুল উলামায় শায়খুল হাদিসের পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন এবং আবুল হাসান আলী নদভীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন। ১৯৪১ সালে জামায়াতে ইসলামির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে তিনি এই দলের উপ-আমির নির্বাচিত হন। তিনি আবুল আলা মওদূদীর দ্বিতীয় স্থানে ছিলেন। ১৯৪২ সালে মওদুদীর সাথে মতবিরোধের পরে তিনি সংগঠন থেকে পদত্যাগ করেন। এরপরে তিনি মুহাম্মদ ইলিয়াস কান্ধলভির তাবলীগী জামায়াতে যুক্ত হন। তিনি দারুল উলূম দেওবন্দের মজলিসে শূরা ও মজলিসে আমিলাহ (কার্যনির্বাহী পরিষদ)-এ দায়িত্ব পালন করেছিলেন এবং মুসলিম ওয়ার্ল্ড লীগের সদস্য ছিলেন। ১৮ শাওয়াল ১৩৩৩ হিজরীতে ব্রিটিশ ভারতের সংযুক্ত প্রদেশের সামভালে জন্মগ্রহণ করেছেন। তাঁর বাবা সুফি মুহাম্মদ হোসেন ছিলেন একজন মধ্যবিত্ত ধনী ব্যবসায়ী এবং জমিদার। মনজুর নোমানী নিজশহর সামভালে সিরাজুল উলুম হিলালী সারাই মাদরাসায় প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন করেছেন । পরে তিনি আজমগড়ের দারুল উলূম মাউতে পড়াশোনা করেছেন। অবশেষে তিনি দারুল উলূম দেওবন্দে ভর্তি হন যেখানে তিনি দুই বছর অবস্থান করেন এবং দাওরা হাদিসের পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে ফারেগ হন । দারুল উলূম দেওবন্দে তাঁর শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন আনোয়ার শাহ কাশ্মীরি , মুফতি আজিজুর রহমান এবং সিরাজ আহমদ রশিদী ।