"নিশ্চয়ই তোমাদের ওয়ালি হচ্ছেন আল্লাহ ও তাঁর রাসূল আর সেই সকল মুমিন- যারা সালাত কায়েম করে এবং রুকু অবস্থায় যাকাত প্রদান করে" (সূরা মায়িদাহ ৫৫, পারা: ৬)
মোরাকাবা মোশাহাদায় নিমগ্ন থেকে বুঁদ হয়ে থাকার মধ্যে এক ধরনের মোহ ও আবেশ আছে বটে। সেই মোহ ও আবেশে নিমজ্জিত হয়ে আজকাল অনেকেই অদৃশ্য জগতের আজগুবি দ্ব্যার্থবোধক ভাবের উন্মেষ ঘটিয়ে নিজের আধ্যাত্মিকতা ফলাতে চেষ্টা করছেন। কিন্তু নবী-রাসূল ও অতীতের আউলিয়াগণের ন্যায় ধ্যানমগ্ন হয়ে আধ্যাত্মিক, মানসিক ও নৈতিক উৎকর্ষ সাধনের সাধক ব্যক্তিত্বের সাক্ষাৎ একেবারেই দূষ্কর। যারা এ মহাসোপানে উপনীত হয়ে হাকিকতের মঞ্জিলে মাকসুদে পৌঁছুতে সক্ষম হয়েছেন তাদের সংখ্যা খুবই নগণ্য। আত্মিক ক্ষমতাসম্পন্ন আউলিয়াগণ ছাড়া অন্যরা দুনিয়ার মোহে আকণ্ঠ নিমজ্জিত। দিদারে এলাহীর পথের অভিযাত্রীগণ সর্বস্ব বিসর্জন দিয়ে আত্মশুদ্ধতাকে অগ্রাধিকার দিয়ে ঐশী প্রেমে মত্ত থাকেন। এই কারণেই গ্রন্থের সূচনায় আমরা পবিত্র কুরআনের একটি আয়াত উদ্ধৃত করেছি, যার মর্মার্থ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
কালামে পাকের সূরা মায়িদার ৫৫নং আয়াতের মর্মার্থ অনুযায়ী আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'য়ালা এই পৃথিবীতে তাঁর কুদরতের বেলায়েত অর্পণ করেছেন তাঁর মনোনীত আম্বিয়া (আলাইহিমুস সালাম) গণের উপর। আম্বিয়াগণ সেই বেলায়েত অর্পণ করেছেন তাঁদের স্থলাভিসিক্তগণের উপর। শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর বেলায়েত অর্পণ করেছেন তাঁর আহলে বাইতের উপর। যারা সার্বক্ষণিক সালাতে আল্লাহর সামনে নতজানু রয়েছেন- যাকে বলে রুকু। অতএব আজকের এই অন্ধকারের যুগে শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সাঃ) এর সেই ঐশী প্রদত্ত বেলায়েত প্রাপ্ত মাওলায়ে কায়েনাত আমীরুল মো'মেনীন হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (আলাইহিস সালাম) এর শাহাদাতের পর কোন সেই ব্যক্তি? যার হাতে বেলায়েতের মহামুক্তির আলোর মশাল এবং যাকে মান্য করলে অন্ধকারের অমানিশা দূর হয়ে ব্যক্তি ও সমাজ জীবন আলোকিত হবে?
আমরা আশাকরছি পাঠক মহলের এই জিজ্ঞাসা ও জ্ঞানতৃষ্ণা নিবারণে মাওলায়ে কায়েনাত হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (আঃ)এর "কুরআন, হাদিস ও ইতিহাস দর্পণে সীরাতে আমিরুল মো'মেনীন" পাঠে কিছুটা হলেও ভূমিকা রাখবে এবং আরো আশাকরছি মাওলায়ে কায়েনাতের আধ্যাত্মিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবন ও কর্মধারা থেকে নিজেকে যে কেউ প্রস্তুত করতে পারবেন।
নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, মানব সভ্যতা যতদিন ঐশী প্রত্যাদেশবাহী নবী-রাসূলগণের বেলায়েত প্রাপ্ত শুদ্ধ আত্মার মানীষীদেরকে একনিষ্ঠতার সাথে অনুসরণ ও অনুকরণ করবে ততদিন এই পৃথিবীতে ন্যায়বিচার, শৃঙ্খলা, প্রশান্তি, মানবিকতা, বিশ্বস্ততা, কোমলতা, দয়া ও মায়া-মমতা ইত্যকার সকল ধরনের মৌলিক মানবিক আধ্যাত্মিক বৈশিষ্ট্যাবলী মানুষের মধ্যে বিরাজ করবে। কিন্তু যখনই এর ব্যত্যয় ঘটবে তখনই দেশ ও সমাজ ঘোর অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে।
আধুনিক ভ্রান্তিবিলাসী সমাজে ও অশান্ত বিশ্বপরিস্থিতিতে মানুষ আজ দিশেহারা। এই সংকট থেকে মানবজাতি মুক্তির পথ অনুসন্ধান করছে। অতএব ইহলৌকিক ও পরলৌকিক মুক্তির পথ খুঁজে পেতে মাওলায়ে কায়েনাতের মতো একজন মহান ব্যক্তির জীবন ও কর্ম অনুসরণ করা অতিব প্রয়োজন যেন এর দ্বারা মানবজাতি সার্বিক মুক্তির পথ খুঁজে পায়। মাওলায়ে কায়েনাত, মানব জাতির ইমাম, আমীরুল মো'মেনীন হযরত আলী ইবনে আবী তালিব (আঃ) হচ্ছেন নবী পাক (সাঃ) এর বেলায়েতের শীর্ষস্থাণীয় স্তরের একজন অনুসরণীয় ও অনুকরণীয় মণিষী- যার জীবন ও কর্ম দিকভ্রান্ত মানুষের পথ চলার আলোকবর্তিকা স্বরূপ। -যার ব্যাপারে রাসূলে মকবুল (সাঃ) বলেছেন, "আমি যার মাওলা আলীও তার মাওলা" এর মানে হল আমি যার অভিভাবক, পৃষ্ঠপোষক ও নেতা, এই আলীও তার অভিভাবক, পৃষ্ঠপোষক ও নেতা। নবী পাক (সাঃ) আরও বলেছেন, "মুমিন ছাড়া কেউ আলীকে ভালবাসবে না এবং মুনাফিক ছাড়া কেউ আলীর সাথে শত্রুতা করবে না"। তারপর তিনি বলেন, "যে আলী থেকে দূরে সরে থাকবে সে-ই পথভ্রষ্ট হবে। কাজেই তোমরা আলীর অগ্রবর্তী হইও না এবং অধিক পশ্চাৎবর্তীও হইও না; বরং আলীর নিকটবর্তী হও"।
এই মহান ইমামের আধ্যাত্মিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, সামরিক ও আন্তর্জাতিক জীবন ও কর্মের উপর বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য তাফসীর, হাদীস ও ইতিহাস গ্রন্থ থেকে পাক-ভারত উপমহাদেশের সনামধন্য আলেমে দ্বীন, মাওলানা ওবাইদুল্লাহ বিন মাজহার জামাল অমৃতসরীর সংকলিত "আরজাহুল মাতালেব" নামক বৃহৎ গ্রন্থখানা বাংলায় "কুরআন, হাদিস ও ইতিহাস দর্পণে সীরাতে আমিরুল মো'মেনীন" নামে ভাষান্তর করেছি; যেন বাংলা ভাষাভাষী সকল ধর্ম ও বর্ণের মানুষেরা এই জীবনী গ্রন্থ থেকে তাদের নিজ নিজ প্রয়োজন পুরণ করে উপকৃত হতে পারেন।
এই গ্রন্থ পাঠে উপকৃত হওয়ার জন্য একজন পাঠকের কোরআন, হাদিস, তাফসীর ও ইতিহাসের সাধারণ জ্ঞান থাকা অত্যাবশ্যক, তা-নাহলে পাঠক মহল ঘটনার সংশ্লিষ্টতার সূত্রের অজ্ঞতা জনিত বিচ্ছিন্নতার কারণে অনেক বিষয়ই তাদের অধরা থেকে যাবে বা কিংকর্তব্য বিমুঢ় হয়ে যাবে। আবার অনেক বিষয়ে খেই হারিয়ে ফেলার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। আমরা আশাকরছি, আরজাহুল মাতালেব যা বাংলায় অনূদিত "সীরাতে আমিরুল মো'মেনীন" গ্রন্থখানা পাঠে তাড়াহুড়ো না করে ধীরস্থির হয়ে চিন্তাশীল মনমস্তিষ্কে সচেতনতার সাথে অধ্যয়ন করবেন।
এই গ্রন্থ অনুবাদে অসংখ্য প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়েছি যা না বললেই নয়। মাওলানা উবাইদুল্লাহ অমৃতসরী তার ভূমিকায় যে দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করেছেন, মূল গ্রন্থের সঙ্গে তা মিলিয়ে দেখলে ষড়যন্ত্রের ব্যাপ্তি সহজেই অনুধাবন করা যায়।
আরজাহুল মাতালেব গ্রন্থ অধ্যয়ন করতে গিয়ে আমরা লক্ষ্য করেছি যে, বিভিন্ন প্রকাশনা থেকে মুদ্রিত সংস্করণে ব্যাপক পার্থক্য বিদ্যমান। কিছু প্রকাশক নবী করিম (সাঃ)এর আহলে বাইতের প্রতি বিদ্বেষপ্রসূত মনোভাব থেকে ইচ্ছাকৃতভাবে পৃষ্ঠা বাদ দিয়েছে, হাদীসে কাঁটছাঁট করেছেন এবং বাক্যবিন্যাসে পরিবর্তন এনেছেন। এর ফলে গ্রন্থকারের মর্যাদা ক্ষুন্ন করার পাশাপাশি হযরত আলী (আঃ) এর মর্যাদাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা চালানো হয়েছে।
আল্লাহর অশেষ মেহেরবানীতে আমরা উক্ত হাদীসসমূহ উৎসগ্রন্থের সঙ্গে মিলিয়ে বক্তব্যকে যথাযথ পূর্ণাঙ্গ করার চেষ্টা করেছি। ফলে বাজারে প্রচরিত আরজাহুল মাতালেব নামের বিভিন্ন অসম্পূর্ণ সংস্করণের তুলনায় এই অনুবাদটি অধিক পরিমার্জিত ও প্রাণবস্তু রূপ লাভ করেছে বলে আমাদের বিশ্বাস। অনুসন্ধিৎসু পাঠকের জন্য এটি একটি সুপাঠ্য ও উপযোগী গ্রন্থে পরিণত হবে- এমনটাই আমাদের প্রত্যাশা। এই গ্রন্থ প্রকাশে অনেক ভাই ও বন্ধুগণ বিভিন্নভাবে তাদের সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন ও উৎসাহিত করেছেন তাদের প্রত্যেকের প্রতি রইল আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। বিশেষ করে সর্বজনাব OBHD-র সম্মানিত সভাপতি শ্রদ্ধেয় ওয়াজেদ আলী ভাই, জনাব মোশাররফ হোসাইন ভাই, অবসর প্রাপ্ত যুগ্মসচিব শ্রদ্ধেয় শাহ আলম ভাই, শ্রদ্ধেয় নিজাম উদ্দিন মজুমদারসহ সকলের প্রতি হৃদয়ের গভীর থেকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। মাওলায়ে কায়েনাতের প্রতি যে প্রেম নজরানা তাঁরা নিবেদন করেছেন এজন্য আল্লাহ যেন নিদানকালে তাদের আহলে বাইতের তরীতে আরোহণ করার তাওফিক দান করেন। হে আল্লাহ। আমাদের এই দোয়া মুনাজাত কবুল করুন। আমিন, ছুম্মা আমিন।
আরয গুজার
আল্লামা ক্বারী মীর রেজা হোসাইন শহীদ প্রশিক্ষক, কোরআন শিক্ষা একাডেমী, ঢাকা।