পিআইডির প্রথম আলোকচিত্রী শেখ মোহাম্মদ ইয়াকুব সম্পর্কে ড. শহিদুল আলমের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। শহিদুলকে বললাম, ‘কোথাও তাঁর সম্পর্কে কোনো লেখা নাই। ফলে বিস্মৃতির অতল থেকে তাঁকে কোনোভাবেই তুলে আনা যাচ্ছে না।’ শহিদুল বললেন, ‘তাঁর একটা সাক্ষাৎকার অনেক আগে কোনো একটা কাগজে ছাপা হয়েছে। খোঁজ করলে পাবে।’ শহিদুলের কথার উপর ভর করে পত্রিকার পাতায় সেই সাক্ষাৎকার খুঁজতে থাকি। প্রতিদিন বাংলা একাডেমির লাইব্রেরিতে গিয়ে দৈনিক পত্রিকার ফাইল খুঁজি। ২০২২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর দৈনিক বাংলার ফাইল ঘাঁটতে গিয়ে হঠাৎ দেখি শেখ মোহাম্মদ ইয়াকুবের তোলা তিনটি ছবি! ছবিগুলো আটচল্লিশের ভাষা আন্দোলনের অগ্নিঝরা দিনের। ১৯৭৪ সালের ৭ জুন তারিখের দৈনিক বাংলার শেষ পৃষ্ঠায় ইয়াকুবের তোলা এমন দুর্লভ ছবি দেখতে পাব—এ ছিল আমার কল্পনারও অতীত। পত্রিকার পাতায় তাঁর ছবি দেখতে পেয়ে আমার চোখে পানি আসে।
পরদিন সকালে যাই জাতীয় প্রেস ক্লাবে। আলোকচিত্রী রফিকুর রহমান, এ কে এম মহসীন ও বুলবুল আহমেদের কাছে ইয়াকুবের কথা জানতে চাই। এই পথিকৃৎ আলোকচিত্রীর কথা শুনতে পেয়ে তাঁরা স্মৃতিকাতর হলেন। তাঁর নিঃসঙ্গ জীবনের কথা বলতে গিয়ে হাহাকার করলেন। তাঁদের কাছে জানতে চাইলাম কবে মারা গেলেন ইয়াকুব? কেউ তাঁর মৃত্যুর দিনক্ষণ বলতে পারলেন না। তবে ভাসা ভাসা বললেন, নব্বয়ের দশক হতে পারে। পরের দিন বাংলা একাডেমিতে গিয়ে ১৯৯০ সাল থেকে দৈনিক বাংলার ফাইল খুঁজতে শুরু করি। টানা ছয় দিন ফাইল ঘেঁটে ১৯৯৫ সালের ৮ জুনের পত্রিকায় পাই তাঁর মৃত্যু সংবাদ। এরপর ‘প্রজন্মের অদেখা দলিলচিত্র’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধ লিখি। প্রবন্ধটি ২০২৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি দৈনিক দেশ রূপান্তরের মলাটে ছাপা হয়। ইয়াকুব যে আটচল্লিশের ভাষা আন্দোলনের একজন দুঃসাহসী আলোকচিত্রী, এই প্রবন্ধের আগে তাঁকে নিয়ে লেখা হয়নি। কোনো গবেষক বিস্তৃর্ণ পরিসরে তাঁকে তুলে ধরেননি। ফলে তাঁর অসম সাহসের গল্প অজানা আমাদের অজানা থেকে গেছে।
বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের প্রথম শহীদ রফিক উদ্দিন আহমেদের মরদেহের ছবি তুলে শাসকের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন আলোকচিত্রশিল্পী আমানুল হক। আমানুলের তোলা ছবিটি ছাড়াও বিভিন্ন প্রকাশনায় রফিকের আরেকটি ভিন্ন অ্যাঙ্গেলের ছবি দেখা যায়। স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন জাগে, এই ছবিটি তাহলে কার তোলা? দীর্ঘ সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে এই প্রশ্নের উত্তর ছিল অজানা। ফলে এই ঐতিহাসিক ছবিটির রহস্য ভেদ করতে আমি তিন বছর ধরে চেষ্টা চালাই। খুঁজতে খুঁজতে পেয়ে যাই এই আলোকচিত্রীর নাম, পরিচয় ও ছবিটি তোলার নেপথ্য কাহিনি। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি অপরাহ্নে ঢাকা মেডিক্যালের জরুরি বিভাগে রফিকের মরদেহের ছবিটি তুলেছিলেন তখনকার সাপ্তাহিক ইত্তেফাকের আলোকচিত্রী মীজানুর রহমান। ইয়াকুবের মতো তিনিও আমাদের কাছে আলোকচিত্রের এক অনালোকিত মনীষা। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে তাঁদের নাম লেখা হয়নি।
স্বীকৃতবঞ্চিত এই দুই আলোকচিত্রীকে নিয়ে এ বছর আমি একটি প্রবন্ধ লিখি। দৈনিক বণিক বার্তার অমর একুশের বিশেষ সংখ্যায় প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়। একই দিনে দ্য বিজনেজ স্ট্যান্ডার্ডের সাপ্তাহিক বাংলা প্রকাশনা ইজেলে ছাপা হয় ‘ভাষা আন্দোলন : পাঁচ আলোকচিত্রীর চোখে’ শিরোনামে ছয় পৃষ্ঠার একটি প্রবন্ধ। বিডিনিউজ অনলাইন প্রকাশ করে ‘ইতিহাসের পুনর্পাঠ : একুশের পাঁচ শহীদ’ শিরোনামে আরো একটি প্রবন্ধ। এছাড়া প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার অনলাইন ফেব্রুয়ারি মাস জুড়ে প্রকাশ করে আমার লেখা আরো বেশ কয়েকটি প্রবন্ধ প্রকাশ। প্রবন্ধগুলোতে উঠে আসে ইতিহাসে স্থান না পাওয়া এই দুই আলোকচিত্রী ছাড়াও মুহম্মদ তকীয়ূল্লাহ, অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম ও আমানুল হকের দুঃসাহসী চিত্রধারণের বাস্তব গল্প।
এইসব প্রবন্ধ পড়ে স্বপ্ন ’৭১ প্রকাশনর প্রকাশক আবু সাঈদ ২৩ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় আমাকে ফোন করেন। বললেন, ‘আপনার প্রবন্ধগুলো গুছিয়ে একটা সংকলন করে দিলে আমরা এ বইমেলায় বইটা প্রকাশ করতে চাই।’ এই বছর আমার কোনো বই প্রকাশের প্রস্তুতি ছিল না। আবু সাঈদের কথায় চারদিনের মধ্যে আমি পাণ্ডলিপির কাজ সম্পন্ন করি। পত্রিকার লেখাগুলোকে বইয়ের ভাষায় রূপ দিতে কিছুটা ঘষামাজা বা পরিমার্জন করি। এ কাজ করতে গিয়ে যেখানেই খটকা লাগে গবেষক ও আলোকচিত্রী মীর শামছুল আলম বাবুর সঙ্গে পরামর্শ করি। কোথাও অসংগতি থাকলে তিনি ধরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। আমার লেখাগুলো পত্রিকায় গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করেছেন বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের আলীম আজিজ, বিডিনিউজের রাজীব নূর, প্রথম আলোর তানিম ইকবাল, ডেইলি স্টারের শামসুদ্দোহা সাজিন ও বণিক বার্তার বাশার খান। এছাড়া মুহম্মদ তকীয়ূল্লার কন্যা শান্তা মারিয়া, আমানুল হকের ছোট বোন অধ্যাপক ড. আয়শা বেগম, ভাগনে অরূপ কামাল, মীজানুর রহমানের পুত্র শাহরিয়ার জিয়াউর রহমান, সাপ্তাহিক ভাওয়াল সম্পাদক আতাউর রহমান, প্রাবন্ধিক আহমাদ মাযহার, আলোকচিত্রী আককাস মাহমুদ, আলোকচিত্রী সৈয়দ লতিফ হোসেন, আলোকচিত্রী সাইফুল আমিন কাজল, কবি দীপংকর দীপক ও লেখক বিপুল জামান নানাভাবে সহযোগিতা করেছেন। সবার প্রতি আমার অশেষ কৃতজ্ঞতা।
বইটির নান্দনিক প্রচ্ছদ করেছেন শিল্পী আনিসুজ্জামান সোহেল। আমার সব বইয়েরই প্রচ্ছদ তিনি অতি যত্ন নিয়ে করেন। কখনো একটা অাঁকেন না। বেশ কয়েকটা অাঁকেন। বলেন, ‘আপনার বইয়ের প্রচ্ছদ অঁাকার আগে বেশ চিন্তা করতে হয়।’ আমার প্রতি তাঁর এই পক্ষপাতিত্বের ঋণ আমি কেমন করে শোধ করব। আরও দুইজন মানুষের কথা না বললে আমার এই অভিযাত্রার গল্প অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। একজন প্রবীণ ফটোসাংবাদিক খালেদ হায়দার আরেকজন সাহিত্য প্রকাশের গ্রাফিক্স ডিজাইনার মনিরুল ইসলাম। শেখ মোহাম্মদ ইয়াকুবের ভালো কোনো পোর্ট্রেট পাওয়া যাচ্ছিল না। খোঁজ নিয়ে জানলাম, খালেদ হায়দারের কাছে এই আলোকচিত্রীর দুটি পোর্ট্রেট আছে। তিনি ইমেইল ব্যবহার করেন না। তাই আমাকে ছবি পাঠাতে পারছিলেন না। আমি তাঁর উত্তরার বাসায় গেলে ইয়াকুরের পোর্ট্রেটের দুটি প্রিন্ট আমার হাতে তুলে দেন। খালেদ হায়দারের এই ঋণ কখনো ভুলব না। মীজানুর রহমান একুশের অপরাহ্নে ভাষাশহীদ রফিকের যে ছবিটি তুলেছিলেন তার নেগেটিভ বা মূল ছবি কোথাও নেই। তবে সাহিত্য প্রকাশ থেকে প্রকাশিত ভাষা আন্দোলন: ইতিহাস ও তাৎপর্য গ্রন্থে মূল ছবিটি ছাপা হয়। মনিরুল ইসলাম এই বইটির মেকআপ করেছিলেন। ফোন করতেই তিনি ১.০৫ মেগাবাইটের ছবিটি আমার ইমেইলে পাঠান। আমানুল হকের তোলা আরও কয়েকটি ছবি পাঠিয়েও তিনি আমাকে কৃতজ্ঞতার বন্ধনে আবদ্ধ করেছেন।
আলোকচিত্রশিল্পের অগ্রজদের নিয়ে অনেক বছর ধরে লেখালেখির চেষ্টা করছি। তাঁদের নিয়ে লিখতে পারলে আমার মনে আনন্দ হয়। বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ের আলোকচিত্রী শেখ মোহাম্মদ ইয়াকুব, মুহম্মদ তকীয়ূল্লাহ, আমানুল হক, অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম ও মীজানুর রহমান। তাঁরা দৃশ্যভাষায় আমাদের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস নির্মাণ করে গেছেন। বলা যায়, জীবনের মায়া তুচ্ছ করে বাঙালি জাতিকে তাঁরা দেখার চোখ দান করে গেছেন। এই বই তাঁদের ঋণ শোধ করার সামান্য চেষ্টা মাত্র। বাংলাদেশের আলোকচিত্রশিল্প নিয়ে আমি যখন লিখতে শুরু করি তখন আমার সামনে কোনো পথ ছিল না। এখনো পথ নেই। আমি পথে নেমেই পথের সন্ধান পাই। আমার এই অনন্ত পথে আপনাদের স্বাগত।
সাহাদাত পারভেজ