আলী প্রয়াস-এর ‘নিসর্গলিপি’ একটি উপন্যাসিকা বা দীর্ঘ চিঠি , যা কোনো সরল সময়রেখায় আবদ্ধ নয় । এটি মূলত এক গভীর আত্মিক সংকটের মনস্তাত্ত্বিক দলিল, যার শিকড় গাঁয়ে, ডাল শহরে, আর পাতা মানুষের ভেতরের অন্ধকারে প্রোথিত। এই আখ্যান একাকীত্ব ও প্রকৃতির মায়াময় বন্ধনকে এক অদ্ভুত মরমী সুতোয় বেঁধেছে । উপন্যাসিকাটির মূল উপজীব্য বিষয়গুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
প্রাণ-প্রকৃতি ও মানুষের বন্ধন: উত্তর চট্টগ্রামের পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত ‘জারুলবুনিয়া’ গ্রামের এক নিঃশব্দ ও ভিন্ন স্বভাবের কিশোর রুহান । তার সবচেয়ে বড় আশ্রয় ও বন্ধু ছিল একটি প্রাচীন জারুলগাছ। প্রকৃতির ভাষা ও গাছেদের নীরব আর্তনাদ রুহানের সত্তাকে এমনভাবে আচ্ছন্ন করে, যা তাকে সাধারণ মানুষ থেকে ধীরে ধীরে প্রকৃতির এক পরম আত্মীয়ে রূপান্তর করে।
শহুরে বাস্তবতা ও যান্ত্রিকতা: রুহান যখন উচ্চশিক্ষার জন্য চট্টগ্রাম শহরে আসে, তখন বলিরহাটের কাঠের দোকানে কাটা গাছের স্তূপ তাকে তীব্রভাবে আহত করে। ইটের দেয়ালের নিষ্ঠুর কোলাহলের বিপরীতে সিআরবি-র শতবর্ষী শিরীষতলা হয়ে ওঠে তার নিশ্বাসের একমাত্র ফুসফুস । এখানে সে খুঁজে পায় সায়রাকে—যে সিআরবি-র সাত রাস্তার মোড়ে বসে ২০ টাকার বিনিময়ে মানুষের প্রেম, দুঃখ ও অভিমানের চিঠি লিখে দেয়। তাদের প্রেম উচ্চারণহীন, যেখানে একে অপরকে ভালোবাসার কথা না বলেও তারা একে অপরের ছায়া হয়ে ওঠে ।
মৃত্যু ও চেতনার পুনর্জন্ম: রুহানের অকালমৃত্যুর পর আখ্যানটি এক অলৌকিক মোড় নেয় । তার সেই জারুলগাছের ছায়ায় আগমন ঘটে সামির নামের এক কিশোরের, যে স্বপ্নের ভেতর রুহানের মায়াময় চোখ দেখতে পায় । সামির কোনো রক্তসম্পর্কের কেউ না হয়েও হয়ে ওঠে রুহানের চেতনার প্রকৃত উত্তরসূরি ও নিসর্গের নতুন পথ ।
পরিশেষে বলা যায়, ‘নিসর্গলিপি’ শুধু একটি গল্প নয়, এটি একটি দর্শন । লেখকের সহজ অথচ গভীর প্রতীকী ভাষা পাঠককে মনে করিয়ে দেয় যে, প্রকৃতি কখনো পুরোপুরি মরে না, সে নতুন রূপে মানুষের মাঝে পুনরায় বেঁচে ওঠে ।
আলী প্রয়াস জন্ম : ২৬ মার্চ। বাবা : ডাঃ ওবাইদুর রহমান মা : গোল বাহার বেগম ঠিকানা: উত্তর লম্বরী, টেকনাফ কক্সবাজার, বাংলাদেশ। শিক্ষা : বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এম.এ. গ্রন্থাগার ও তথ্যবিজ্ঞানে এম.এ.